গতকাল ছিল বইমেলার নবম দিন। মেলায় ঢোকার আগে ভেবেছিলাম সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে লোকসমাগম তুলনামূলকভাবে কম হবে। কিন্তু কিসের কী! ঠিক ৪টায় ঢোকার মুহূর্তে দেখি, অনেক মানুষ। সাড়ে ৬টার দিকে যখন বের হচ্ছি তখন প্রবেশপথে জনস্রোত। আমাকে রীতিমতো ভিড় ঠেলে টিএসসির সামনে আসতে হলো। এই বর্ণনা থেকে বুঝতে পারছেন, কত লোকের সমাগম হয়েছিল গতকালের বইমেলায়।
টিএসসির দিক থেকে বইমেলায় ঢুকলেই সোজাসুজি দেখা মেলে অন্যতম পুরোনো অভিজাত প্রকাশনী মাওলা ব্রাদার্সের। সেটি পেরিয়ে আজ পরের কয়েকটি সারির স্টল ঘুরে দেখে বুঝতে চাইলাম, এবার মেলার কোনো বিশেষত্ব আছে কি না। ঠিকই চোখে পড়ল। প্রায় পাশাপাশি দেখা মিলল বেশ কয়েকটি স্টলের, যারা ইসলামি বই প্রকাশ করেন। সোলেমানিয়া বুক হাউস, আলোকিত প্রকাশনী, মাকতাবাতুল হেরা, ইসলাম হাউস, মক্তব প্রকাশন, আশরাফিয়া বুক হাউস, হাদীছ ফাউন্ডেশন, ইত্তিহাদ, মাকতাবাতুল হিযাজ, কাতামিন, আলিফ পাবলিকেশন্স এরকমই কয়েকটি স্টল। মক্তব প্রকাশনে ‘মিশেল ফুকো রুহানিয়াত ও ইসলাম’ নামের একটা বই চোখে পড়ল। লেখক ফাহমিদ-উর-রহমান। বোঝা গেল পশ্চিমী জ্ঞানতাত্ত্বিকরা ইসলামকে কী চোখে দেখেন এবং এ ধরনের বইয়ের প্রতি কোনো কোনো তরুণ লেখকের বিশেষ আকর্ষণ আছে। এসব স্টলের একটু দূরেই মল্লিক ব্রাদার্স ও খোশরোজ কিতাবিস্তানের দুটো আলাদা স্টল। একসময়, স্বাধীনতার আগে, এ দুটো প্রকাশনীর খ্যাতি ছিল। কিন্তু কালের ধারায় তাদের সেই জৌলুশ আর নেই। মেলায় আসা বইগুলোও সৃজনশীল নয়।
লেকের কোলঘেঁষে ‘সাড়ে ৩ দিনের পত্রিকা’ স্টল দিয়েছে। এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় বেঙ্গল বুকস প্রকাশনা থেকে। গতবারও মেলায় এই পত্রিকাটি দেখেছি। আর্ট পেপারে ছাপা ট্যাবলয়েড সাইজের পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় শুধু বইমেলায়। যেহেতু অর্ধ-সাপ্তাহিক। ফলে ফেব্রুয়ারিজুড়ে এর আটটি সংখ্যা বের হবে। এখন পর্যন্ত বেরিয়েছে দুটি সংখ্যা। প্রথম সংখ্যার বিষয়টি বেশ আকর্ষক- অনুবাদ। এতে প্রকাশিত খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের নিবন্ধটি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু প্রত্যয় হামিদের ‘বাংলাদেশে অনুবাদচর্চা ও বিকাশ’ নামের নিবন্ধের বিবরণ বিক্ষিপ্ত মনে হলো। স্বাধীনতার আগে আমাদের অনুবাদকরা অনুবাদ নিয়ে কী ভাবতেন, সেই সময়ের কারও একটা লেখা যদি পুনঃমুদ্রণ করা যেত! জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়ে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংখ্যার বিষয়টি খুবই গতানুগতিক। পরবর্তী সময় ৬টি সংখ্যার বিষয় এবং কারা লিখবেন সেটা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকব।’
আগে শুনেছি, ‘বইমেলায় পাইরেসি করা বই বিক্রি হয়। এবার চাক্ষুষ হলো। একটি প্যাভিলিয়নে নীরদ সি. চৌধুরীর বাঙালী জীবনে রমণী, কিশোর মহাশ্বেতা অমনিবাস, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, পথে প্রবাসে বইগুলো দেখলাম। এসব বইয়ের এখনো কপিরাইট রয়ে গেছে। কিন্তু কী করে চন্দ্রবিন্দু.com থেকে প্রকাশিত পাইরেসি করা বইগুলো বইমেলায় বিক্রি হচ্ছে, বুঝতে পারলাম না। বাংলা একাডেমির দায়িত্ব হচ্ছে এসব বই যাতে মেলায় বিক্রি না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া। পাইরেসি করার এই প্রবণতা আমাকে নীলক্ষেতের পাইরেটেড বইয়ের কথা মনে করিয়ে দিল।’
বাংলাদেশে চিরায়ত বইয়ের শীর্ষ প্রকাশক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। তারা মেলায় গত দুই দিনে এনেছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বই- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘আমার টেলিভিশন জীবন’, নিয়াজ মোরশেদের অনুবাদে চার্লস ডিকেন্সের ‘দুই নগরীর গল্প’ ও অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য ইম্পর্ট্যান্স অভ বিয়িং আর্নেস্ট’ এবং সৈয়দ মো. গোলাম ফারুকের অনুবাদে মার্কাস টুলিয়াস সিসেরোর ‘শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা’।
মেলায় ঘণ্টাতিনেক ঘোরা হলো। ফিরছি যখন, একেবারে লেক আর উত্তর-পূর্ব মাঠের কোণে চোখ পড়ল অ আ ক খ নামের এক ইউনিটের একটা স্টলের ওপর। বেশ নাম তো। থমকে দাঁড়ালাম। মেঝেতে ফরাস পাতা। কোনো শেলফ বা টেবিল নেই। ফরাসে এক তরুণ আর তরুণী বসা। বইপত্তরও নেই। কৌতূহল বাড়ল। তরুণীর নাম শেখ ফাতিমা পাপিয়া। তিনি জানালেন তাদের স্টলটি একটি পাঠচক্রের স্টল। এই প্রথম, এত বছরে, বইমেলায় পাঠচক্রের স্টল চোখে পড়ল। পাপিয়া জানালেন, তিনি সরকারি তিতুমীর কলেজের দর্শন অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তাদের একটা পাঠচক্র গ্রুপ আছে ফেসবুকে একই নামে। তাতে যুক্ত প্রায় তিন হাজার সদস্য। ঢাকার বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে তারা পাঠচক্রটি করেন। মাসে দুবার। অনলাইনেও পাঠচক্র হয়। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের যুক্ত করে তারা এই পাঠচক্রটি চালান। প্রায় দুই বছর ধরে চলছে এটি। এবারই বইমেলায় তাদের ঠাঁই হলো। এখানেও, পুরো মাসজুড়ে প্রতিদিন তারা পাঠচক্রের মতো এই স্টলের সামনে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। অন্য কোনো বিষয় নয়, রাজনীতি নয়, তাদের আড্ডার বিষয় মানবসমাজকে বদলে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পড়া বই। একে বলা যায় পাঠ-আড্ডা। আড্ডারুদের চমকপ্রদ অভিনব আইডিয়া।
বইমেলা যখন ছেড়ে আসছি তখন মনে হলো, ‘এ রকম পাঠ-আড্ডারুদের সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায়, আমরা তাহলে আলোকিত প্রজন্ম পেতে পারি। এরকম আলোকিত প্রজন্মের প্রয়োজন এখন সত্যিই খুব বেশি।’