ডাকসু নির্বাচনের এক প্রার্থীর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা বাম জোট মনোনীত ‘অপরাজেয় ৭১’- এক নারী প্রার্থীকে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। ছাত্রদল-শিবির বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। এ ছাড়া শিক্ষক নেটওয়ার্ক, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, ছাত্র ইউনিয়ন (মাহির-বাহাউদ্দিন), সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (বাসদ) ও ছাত্রলীগ-বিসিএল (বাংলাদেশ জাসদ), ছাত্র ফেডারেশনসহ নানা সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এমন ঘটনার নিন্দা-প্রতিবাদ এবং হুমকিদাতাকে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
মঙ্গলবার (২ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহমিনা আক্তার ও মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘হাইকোর্টে একজন প্রার্থীর রিটের বিষয়কে কেন্দ্র করে, সেই নারী প্রার্থীকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে গণধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। হুমকিদাতা আলী হুসেনকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।’
বেলা ১২টায় ঢাবির পায়রা চত্বর থেকে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘নারী নিপীড়নমূলক কথাবার্তা ৫ আগস্টের পর থেকে চলে আসছে। কিন্তু প্রশাসন আজ পর্যন্ত এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যার কারণে আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে গণধর্ষণের পদযাত্রার হুমকির মতো একটি ঘটনা দেখতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনারের কাছে আমরা এখন পর্যন্ত সাতটি অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যার ফলে এমন বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।’
ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘গত সোমবার আলী হুসেন নামে এক শিক্ষার্থী তার নারী সহপাঠীকে গণধর্ষণের হুমকি দিয়েছে। অথচ, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং ঢাবি প্রশাসন তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অবিলম্বে যেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ একাডেমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
গতকাল দুপুরে ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র, নারী হেনস্তা, চবি ও বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অব্যাহত মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে শিবির।
ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থীকে গণধর্ষণের হুমকি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেত্রীকে হেনস্তার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি করেছেন ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা।
শিবিরের পাল্টা অবস্থান: ‘হুমকিদাতাকে শিবির বলা এক ধরনের প্রোপাগান্ডা’।
গতকাল বিকেলে মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু নির্বাচনে শিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেন, ‘একটি চক্র আমাদের বিরুদ্ধে দায় চাপানোর রাজনীতি করছে। হুমকিদাতার ফেসবুক প্রোফাইলে ছাত্রদলেরও ১০টির বেশি পোস্ট আছে। কিন্তু কেউ তাকে ছাত্রদল বলছে না, বরং একটি ছবি দেখে তাকে শিবির হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।’
ফরহাদ দাবি করেন, ‘আমি নিজে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ফোন করে আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি।’
শিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম বলেন, ‘ছবি তুললেই কেউ শিবির হয়ে যায় না। এটি হাসিনার ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির নতুন মোড়।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগ: হুমকির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন
হুমকির ঘটনার প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সহকারী প্রক্টর মুহাম্মদ মাহবুব কায়সারকে। সদস্য হিসেবে আছেন সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া ও মো. রেজাউল করিম সোহাগ। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রক্টর দপ্তর।
এদিকে অনেকের শঙ্কা ও অভিযোগ ডাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। প্রার্থীরা বলছেন, যেকোনো মূল্যে ডাকসু নির্বাচন যে নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে তা নিশ্চিত করা হবে; প্রয়োজনে আন্দোলনেও নামতেও প্রস্তুত তারা।
গতকাল সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, “ডাকসু নির্বাচন পেছানো নিয়ে এখনো ষড়যন্ত্র বহাল রয়েছে। তবে কোনোভাবেই নির্বাচন পেছাতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়েই ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদি নির্বাচন পেছানোর কোনো পাঁয়তারা করা হয়, ক্যাম্পাসে আরেকটি জুলাই নেমে আসবে।’
এদিকে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ডাকসু নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়া হাইকোর্টের আদেশ আজ (বুধবার) পর্যন্ত স্থগিত করেছেন- এমন খবর পাওয়ার পরপরই বিক্ষোভ নামে একদল শিক্ষার্থী। তারা নির্ধারিত সময়ে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন।
অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে লড়ছেন ফাতেহা শারমিন এ্যানির সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট আমাদের সঙ্গে তামাশা করেছেন। গত সোমবার ডাকসু নিয়ে স্থগিতাদেশ দেওয়া হলো, পরে সেই স্থগিতাদেশ স্থগিত করে দেওয়া হয়। এখন সেই স্থগিতাদেশ আবার বহাল রাখা হচ্ছে। যেই ডাকসুর জন্য আমরা আন্দোলন করছি, সেখানে আমাদের হাইকোর্ট দেখিয়ে ডাকসু নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমরা নির্ধারিত সময়েই ডাকসু নির্বাচন চাই যেকোনো মূল্যে। আমরা রাজপথে আছি এবং আমাদের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব।”
এদিকে ছাত্র অধিকার পরিষদ-সমর্থিত ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী বিন ইয়ামীন মোল্লা খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট একের পর এক রায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের পালস পরীক্ষা করে দেখছে। শিক্ষার্থীরা যদি রাস্তায় না থাকে, তারা তখন এটি বন্ধ করে দেবে। ডাকসু নির্বাচন আমাদের অধিকার, আমরা চাই না এই ক্যাম্পাসে এই দখলদারত্বের রাজনীতি, গেস্টরুম-গণরুম আর ফিরুক। আমরা রাজপথে থেকে নির্ধারিত সময়েই আমাদের অধিকার ডাকসু নির্বাচন আদায় করেই ফিরব।’
গতকাল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডাকসু আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বদ্ধপরিকর। এছাড়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আজ বুধবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে বিষয়টির সম্পূর্ণ নিষ্পত্তির জন্য শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘ডাকসু নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকাসংক্রান্ত হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের ওপর স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়িয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এ আদেশ দেন। যে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন সেটি বুধবার শুনানির জন্য নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়েছেন চেম্বার বিচারপতি।’
গত সোমবার রাতে ডাকসু নিয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া। এই বিষয়ে কোনো রাখঢাক নেই। অভ্যন্তরীণ, বহিস্থ এবং বহুমুখী বাধা-বিপত্তি আসবেই এবং আসছে। এই যে মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে, এগুলোও বাধা-বিপত্তির অংশ। আমরা অংশীজনদের নিয়ে এসব বাধা মোকাবিলা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদের দাবির জন্যই সাহস করে অনেক রকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছি। তাই বলব পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে মূল জায়গায় ফোকাস রাখতে হবে। ধৈর্যের সঙ্গে মাথা ঠাণ্ডা রেখে যাবতীয় ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আমাদের সামনে এগোতে হবে।’
‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ইশতেহার ঘোষণা
গতকাল সন্ধ্যায় মধুর ক্যানটিনে ঢাবির স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের নেতৃত্বে থাকা উমামা ফাতেমা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। ১১ দফার এ ইশতেহারে রয়েছে- একাডেমিক মানোন্নয়ন, গণরুম সমস্যার সমাধান, গবেষণা ফান্ড বৃদ্ধি, ক্যারিয়ার উন্নয়ন, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, আবাসনসংকট নিরসন, পরিবহন উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন, ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা। এ ছাড়া প্রথম ৩০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যানে উল্লেখ রয়েছে- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রোডম্যাপ প্রণয়ন, জরুরি সংস্কার, শিক্ষার্থী সংলাপ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু ও গবেষণা বরাদ্দ শুরু।
ইনসানিয়াত বিপ্লবের ইশতেহার ঘোষণা
ভিপি প্রার্থী তাহমিনা আক্তারের নেতৃত্বে ‘বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লব স্টুডেন্ট ফ্রন্ট’ শুধু একটি পদে (ভিপি) নির্বাচন করছে। তাদের ইশতেহারে রয়েছে- দলীয় আধিপত্যমুক্ত ক্যাম্পাস, পরীক্ষার ফি বাতিল, গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্র সংসদ তহবিলের দুই-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ, আসনসংখ্যা ও আবাসন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি।