রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকটে ভুগছে। ফলে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ফি নেওয়া হলেও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম নিয়মিত হয় না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা হোস্টেলের দাবিও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আইবিএতে প্রায় সাড়ে ৫০০ শিক্ষার্থী পড়ছে। কিন্তু স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ছয়জন। আগে মোট শিক্ষক ছিলেন ১১ জন। তাদের মধ্যে তিনজন বর্তমানে দেশের বাইরে, দুজন অবসর নিয়েছেন। আগামী জানুয়ারিতে আরও একজন অবসরে যাবেন। ফলে শিক্ষক সংকট দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় একাধিকবার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্ল্যানিং কমিটি তা বাতিল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি থাকলেও ইউজিসির কিছু বিধিনিষেধের কারণে নিয়োগ আটকে আছে। ইনস্টিটিউটে মাত্র তিনজন স্টাফ কাজ করছেন, কর্মকর্তার সংকটও রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ হয় না। আইবিএর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২৭ আগস্ট, যা শেষ হয়েছে এই বছরের ১৩ অক্টোবর। এখনো পরবর্তী সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়নি। মাত্র কয়েকটা কোর্সের পরীক্ষা শেষ করতে দেড় থেকে দুই মাস লেগে যায়। এরপর শিক্ষক সংকটে ক্লাস শুরু হয় না। তাদের অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয়। আইবিএর শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা হোস্টেলের কথা থাকলেও তারা সেটি পাননি। ফলে আবাসিক হল থেকে ভবনটি ২-৩ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হয়। আবাসিকতার জন্য আইবিএর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে হলগুলোতে প্রতি অ্যালোটমেন্টে ১ শতাংশ করে তাদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি বিনোদপুর গেটের উত্তরে প্রায় তিন একর জমির ওপর আইবিএর নিজস্ব অর্থায়নে নতুন ভবন উদ্বোধন করা হয়। ৭ কোটি ২১ লাখ টাকায় নির্মিত এ ভবন পুরোপুরি নিজস্ব ব্যয়ে তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয়-ব্যয়ে চলছে, বরং প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রায় ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়।
আইবিএর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মফিজুর রহমান ইমন বলেন, ‘ভর্তির সময় এককালীন ১৪ হাজার টাকা দিতে হয়। প্রতি সেমিস্টারে দিতে হয় ৯ হাজার টাকা। বেশি ফি দিয়েও আমরা সেবা পাই না। ক্লাস ও পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতা, ফল প্রকাশে দেরি সব মিলিয়ে আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে। হল না পাওয়ায় পুরো পড়াশোনা মেসেই কেটেছে। স্টাফ সংকটে একটি সার্টিফিকেট তুলতেও ১০ দিন ঘুরতে হয়।’
আইবিএর পরিচালক অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমাদের নিজেদের খরচে চলতে হচ্ছে। আমি দায়িত্ব নিয়েছি গত বছর, এর আগের পরিচালক দুই বছরের কিস্তি বাকি রেখেছিলেন, যেটি আমি পরিশোধ করেছি। এরপর চলতি বছর থেকে এই কিস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করে সাড়ে ২২ লাখ টাকা করা হয়েছে বলে জেনেছি। তবে এ বিষয়ে জানতে আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু তারা এখনো বিষয়টা পরিষ্কার করেননি। শিক্ষক স্বল্পতাসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে একদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসন কোনো সাপোর্ট না দিয়ে কিস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। এভাবে কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমরা হোস্টেল করার জন্য টাকা ঋণ হিসেবে চেয়েছি, এই টাকা দিয়ে আপাতত কাজ করে পরে পর্যায়ক্রমে কিস্তিতে সেই টাকা শোধ করে দেওয়া হবে।’
শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কয়েকবার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু প্ল্যানিং কমিটি প্রতিবারই তা বাতিল করে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হয়ে আছে। সম্প্রতি আমি আরও একটি প্ল্যানিং প্রস্তুত করেছি, দু-এক দিনের মধ্যেই প্ল্যানিং কমিটির মিটিং আছে। আশা করি এবার পাস হবে।’
সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী আইবিএ নিজস্ব কাঠামোতে চলে। তাদের আলাদা ফান্ড আছে, যা দিয়ে তারা কার্যক্রম চালায়। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। তবে তারা যদি আমাদের শিক্ষক নিয়োগের প্ল্যানিং দেয়, সে ক্ষেত্রে প্রশাসন নিয়োগ দিতে পারবে। আর একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হয়ে ফি প্রদানের ক্ষেত্রে এত তারতম্য থাকবে এটিও আমি মনে করি অসংগতি। এমনটি হওয়া উচিত নয়।’
প্ল্যানিং কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেই ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা যদি মনে করেন নিয়োগের প্রয়োজন তাহলে তারা আমাদের চাহিদা জানাবেন। আর যদি মনে করেন এই জনবল দিয়েই কার্যক্রম চালানো যাবে, তাহলে সেটি তাদের ব্যাপার। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছু করার নেই। আমাদের নিয়োগেও কোনো বাধা নেই, বিভিন্ন বিভাগে আমরা শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি।’
হোস্টেলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আবাসিকতা সংক্রান্ত এই সমস্যার বিষয়টা আমরাও খেয়াল করেছি। কিন্তু আইবিএর নিজস্ব নীতিমালা থাকায় সেখানে আগে পরিবর্তন করতে হবে। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ প্রয়োজন।’