বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত এখনো বিকাশমান। তবে ২০২৫ সাল স্পষ্ট করে দিয়েছে এক সময় যে খাতটি আস্থার সংকটে ভুগছিল, সেটি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, সেবার মানের ধারাবাহিক উন্নতি এবং গ্রাহকের আস্থা তৈরির প্রতি জোর। এই রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল দেশের বৃহত্তম অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজ।
দারাজ গ্রুপের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার ও দারাজ বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বেন ই মনে করেন, বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আস্থার অভাব। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধি, ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার, লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ার ফলে ই-কমার্স এখন প্রান্তিক অবস্থান ছেড়ে মূলধারায় আসছে। বর্তমানে মোট খুচরা বাজারের মাত্র ২-৩ শতাংশ অনলাইনে হলেও, আগামী কয়েক বছরে এটি দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
এই আস্থা তৈরির প্রক্রিয়ায় ২০২৫ সালে দারাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়- পুরো প্ল্যাটফর্মে ১৪ দিনের রিটার্ন সুবিধা চালু করা। আগে এই সুবিধা মূলত দারাজমল পণ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যেখানে বেশিরভাগ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাত দিনের মধ্যে রিটার্ন সুবিধা দেয়, সেখানে এই পদক্ষেপ গ্রাহক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
দারাজের আস্থাভিত্তিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দারাজমল। আলিবাবার টিমল মডেল অনুসরণে তৈরি এই চ্যানেলে শুধুমাত্র যাচাইকৃত ব্র্যান্ড ও অনুমোদিত বিক্রেতারা পণ্য বিক্রি করতে পারেন। দারাজমলের আওতায় রয়েছে ‘অথেনটিসিটি গ্যারান্টি’, যার মাধ্যমে নকল পণ্য শনাক্ত হলে প্রতিস্থাপন এবং প্রমাণিত হলে তিনগুণ ক্যাশব্যাক দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে দারাজমলের ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি ও গ্রাহক আস্থা উভয়ই বেড়েছে, আর মল ব্যাজটি দ্রুত বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ই-কমার্স ইকোসিস্টেমে বিক্রেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বাংলাদেশের অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা প্রথমবারের মতো অনলাইনে ব্যবসা করছেন। তাদের সহায়তায় দারাজ সম্প্রসারণ করেছে দারাজ ইউনিভার্সিটি, যেখানে পণ্য তালিকাভুক্তি, অর্ডার ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক জ্ঞান নিয়ে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইনকিউবেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে নতুন বিক্রেতাদের হাতে-কলমে সহায়তা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে পণ্য তালিকা উন্নয়ন ও ক্রেতা-বিক্রেতা যোগাযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
লজিস্টিকস বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় দারাজ শুরু থেকেই নিজস্ব ডেলিভারি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। বর্তমানে দারাজ এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মের ৭০ শতাংশের বেশি অর্ডার ডেলিভারি করে এবং এটি এখন প্ল্যাটফর্মের বাইরের ব্র্যান্ড ও ব্যবসার জন্যও সেবা দিচ্ছে। ৬৪টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গড়ে দুই দিনের মধ্যে ডেলিভারি সম্ভব হয়েছে, আর ঢাকায় একই দিনে ডেলিভারি চালুর প্রস্তুতিও চলছে। বড় ক্যাম্পেইনের সময়ও ডেলিভারি গতি প্রায় স্বাভাবিক রাখতে পারা এই সক্ষমতারই প্রমাণ।
দারাজের ১১.১১-এর মতো বড় ক্যাম্পেইনগুলো এখন বাংলাদেশের ই-কমার্স সংস্কৃতির অংশ। তবে এসব ক্যাম্পেইন গ্রাহকদের আচরণও স্পষ্ট করে। ছাড়ের সময় গ্রাহকরা বড় মূল্যের পণ্যে আগ্রহী হলেও, দৈনন্দিন প্রয়োজনের পণ্যের জন্য তারা নিয়মিত অনলাইনে ফিরে আসেন। এই প্রবণতা মাথায় রেখে দারাজ ২০২৫ সালে সিঙ্গেল-ওয়্যারহাউস ফুলফিলমেন্ট ও এভরিডে লো প্রাইস (ইডিএলপি) চ্যানেল জোরদার করে, যা বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২০ শতাংশ অর্ডার পরিচালনা করছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নেও দারাজ বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দারাজ ফিউচার লিডারস (ডিএফএলপি) প্রোগ্রামের মাধ্যমে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের বিভিন্ন বিভাগে কাজের সুযোগ দিয়ে ভবিষ্যৎ ই-কমার্স নেতৃত্ব তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডি-উইমেন উদ্যোগের মাধ্যমে নারীদের নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দারাজ মনে করে, বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে আরও শক্তিশালী করে।
তবে খাতটির বিকাশে নীতিগত অনিশ্চয়তা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বেন ই মনে করেন, ই-কমার্স খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের জন্য স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা জরুরি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। দেশের বৃহত্তম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দারাজ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে।
বেন ই-এর মতে, দারাজ কেবল অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম নয়। লজিস্টিকস, বিক্রেতা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পেমেন্টে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ এবং তার পরের দিকে তাকিয়ে তিনি আশাবাদী। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাড়তে থাকা ভোক্তা আয় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে ই-কমার্সের বিস্তার আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন তিনি। দারাজের লক্ষ্য হলো দ্রুত ডেলিভারি, উন্নত সেবা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে শিল্পখাতকে আরও পেশাদার করে তোলা।
২০২৫ সালে কোনো একক ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিক ছোট ছোট উন্নতিই দারাজের অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি ছিল। এই ধীর কিন্তু স্থির অগ্রগতিই আগামী দিনে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞপ্তি/