চারদিকে থই থই বানের পানি। দূরে একটি ভেলা ভাসছিল। ভেলাটির চারদিকে খালি বোতল বাধা ছিল। বর্ষাকালে এভাবেই মাছ ধরেন লোকজন। ভেলায় থাকা এক লোক হঠাৎ উধাও। লোকটি কোথায়? দূর থেকে এমন উৎসুক্যে লোকজন ওই ভেলাটি তীরে টেনে এনে চারপাশে খোঁজ করেন। একটানা প্রায় চারঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে শেষে ভেলার নিচে লোকটির মরদেহ পাওয়া যায়। এরপর মরদেহ ভেলায় করে নিয়ে দাফনের জন্য চলে শুকনো মাটির সন্ধান। অতঃপর সন্ধ্যার পর দাফন সম্পন্ন হয়।
সিলেটের কানাইঘাট-জকিগঞ্জ সড়কপাশে বন্যাকবলিত এলাকায় একটি ভেলা ও একজনের মৃত্যু ঘিরে প্রাচীন মনসামঙ্গল কাব্যের লখিন্দর কাহিনির মতো ঔৎসুক্য ছড়িয়েছিল। পুরান কাহিনিতে আছে, লখিন্দরকে মৃত অবস্থায় ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভাসতে ভাসতে শেষে ঐশ্বরিকভাবে বেঁচে উঠেছিল লখিন্দর। বন্যাকবলিত এলাকা জকিগঞ্জে লোকটিকে লখিন্দর হতে হয়নি। মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। নিজের বানানো ভেলা থেকে পড়ে মারা যান। খালি ভেলা ভাসতে দেখে তার সন্ধান চলে। ভেলায় ভাসতে ভাসতে যখন তাকে উদ্ধার করা হলো, তখন তিনি আর বেঁচে নেই। ভেলার নিচে থাকতে থাকতেই মারা যান।
তার নাম আব্দুল হালিম (৫০)। নিজ এলাকায় তিনি ‘হালিম ড্রাইভার’ নামে পরিচিত। পুরান কাহিনির লখিন্দরের মতো এ কাহিনি ঘিরে বুধবার (১৯ জুন) বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কানাইঘাট-জকিগঞ্জের শাহবাগ সড়ক এলাকা সরব ছিল। খবর পেয়ে বন্যা উপদ্রুত এলাকা মাড়িয়ে হাজারো মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হন। লখিন্দরের মতো বিলাপে ভারী হয় চারপাশ। জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এ ঘটনার পর বন্যাকবলিত এলাকায় সাধারণ মানুষজনের চলাচলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল কানাইঘাট উপজেলার পাশের হলেও স্থানটি জকিগঞ্জের। হালিম ড্রাইভারের বাড়িও জকিগঞ্জ। তিনি কানাইঘাট-জকিগঞ্জ সড়কে লেগুনা চালাতেন। নিজ এলাকায় তিনি এক নামে পরিচিত। গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে সড়কে পানি ওঠায় হালিম ড্রাইভার আর গাড়ি নিয়ে বের হননি। নিজে একটি ভেলা তৈরি করেন। ভোরে সেই ভেলা নিয়ে বের হন। পরিবারের সদস্যদের জানান, তিনি বানের পানিতে মাছ শিকারে যাচ্ছেন। ভেলার চারদিকে খালি বোতল দিয়ে তৈরি করেন মাছ ধরার ফাঁদ।
এ পদ্ধতি ভেলাটিকে ভাসিয়ে রেখেছিল। হালিম ড্রাইভারের মাছ ধরার দৃশ্য পাশের সড়ক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। বেলা ১১টার দিকে কেবল ভেলাটি দেখা যাচ্ছিল। হালিম ড্রাইভারকে দেখা যাচ্ছিল না। খালি ভেলাটি তীরে ভিড়লে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। এক পর্যায়ে ভেলার নিচে মাছ ধরার ফাঁদে আটকা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বন্যাকবলিত এলাকায় তার দাফন নিয়ে পড়তে হয় আরেক ভোগান্তিতে। বেলা দুইটার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজির পর দাফনের জন্য একটি পারিবারিক করবস্থান পাওয়া যায়, যেখানে বন্যার পানি ওঠেনি। সেখানে দাফন করা হয়।
ঘটনাটি দিনভর লোকমুখে আলোচিত হচ্ছিল জানিয়ে ওই এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান খবরের কাগজকে জানান, জকিগঞ্জের বারোহাল ইউনিয়নের শাহবাগ পশ্চিম মহিদপুর গ্রামে হালিম ড্রাইভারের বাড়ি। শাহবাগ ঘাটেরবাজার ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে রাতে দাফন হয়। তিন মেয়েসন্তানের জনক তিনি। শ্রমজীবী পরিবারে একমাত্র চালিকাশক্তি মানুষটির এভাবে চিরবিদায় নেওয়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
হালিম ড্রাইভার ঠিক কী কারণে মারা গেছেন এটি স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলেছেন সাপের কামড়ে। কিন্তু শরীরে এ রকম কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার মৃত্যু ঘিরে ‘লখিন্দর’ কাহিনির প্রকাশ ঘটেছে সিলেট ল কলেজের সাবেক ভিপি মাহবুবুল হক চৌধুরীর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। ভেলা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নৌকায় করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে এমন মন্তব্য প্রকাশ পায়।
মাহবুবুল হক চৌধুরী জকিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। প্রত্যক্ষদর্শী নেই বলে হালিম ড্রাইভারের মৃত্যুর কারণ অজানা। ভেলায় থাকা অবস্থায় সাপের কামড়েও মৃত্যু হতে পারে। ভেলা ও লাশ নিয়ে দাফনের জন্য ঘোরাঘুরি থেকে লখিন্দরের প্রসঙ্গের অবতারণা হয়েছে। ঘটনাটি আসলে সে রকম কিছু নয়।’
এদিকে, এ ঘটনার পর জকিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন বন্যা উপদ্রুত এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। বুধবার রাতে যোগাযোগ করলে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফসানা তাসলিম খবরের কাগজকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, মর্মান্তিক এ ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকায় সতর্কতামূলক বিশেষ প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইউএনও বলেন, ‘এ ঘটনার পর বুধবার বিকেলে এক দফা সতর্কতামূলক প্রচার চালানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে এই প্রচার আরও জোরদার করা হবে। মানুষজনকে মাছ ধরা বা জীবনযাপনে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার প্রচার বন্যা পর্যন্ত চলমান থাকবে।’