এবার জোড়া খুনের মামলায় হুকুমের আসামি হলেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. সাজ্জাদ ওরফে ছোট সাজ্জাদ। নগরের প্রাইভেট কারে ‘ব্রাশফায়ার’ করে দু’জনকে খুনের দুই দিন পর সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় মামলা হয়েছে। এতে সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয়ে আরও ৬-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে নগরীর বাকলিয়া থানায় এ মামলা করেন। এর আগে গত ২৯ মার্চ রাতে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড়ের রাজাখালি ব্রিজের সামনে গোলাগুলি হয়। ওই গোলাগুলি চকবাজারের নবাব সিরাজদ্দৌলা রোড় পর্যন্ত গড়ায়। এতে ২ জন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন আরও দুইজন।
মামলায় মো. সাজ্জাদ, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, মোহাম্মদ হাছান, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, রায়হান ও বোরহানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলার গাড়ি চালক ছিলেন মানিক আর ব্যক্তিগত কাজ দেখাশোনা করতেন আবদুল্লাহ। গত ২৯ মার্চ রাতে একটি প্রাইভেটকারে তারা নগরের নতুন ব্রিজ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেখানে সারোয়ার, মানিক, আবদুল্লাহ, রবিন, হৃদয় ও ইমন উপস্থিত ছিলেন।
আড্ডা দিয়ে তারা রাত ২টায় বাড়ি ফেরার সময় রাজাখালী ব্রিজে পৌঁছালে ছয়-সাতটি মোটরসাইকেল থেকে প্রাইভেটকার লক্ষ্য এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়া হয়। গুলিতে গাড়ির পেছনের গ্লাস ঝাঝরা হয়ে যায়। এতে মানিক গুলিবিদ্ধ হন। ওই অবস্থায় মানিক বহদ্দারহাটের দিকে না গিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড দিয়ে চকবাজারের দিকে চলে যান। তখন মোটরসাইকেলগুলো তাদেরকে পেছনে ধাওয়া করে।
রাত সোয়া ২টার দিকে চকবাজার থানার নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কে মানিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি থামালে ধাওয়া করা মোটরসাইকেল থেকে হাছান, ইমন, বোরহান, খোরশেদ, রায়হানসহ অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজন তাদের হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। গুলিতে মানিক ও আবদুল্লাহ, হৃদয় ও রবিন জখম হন। গাড়িতে থাকা সারোয়ার ও ইমন কৌশলে নেমে যান। এরপর গুলি ছুঁড়তে থাকা ব্যক্তিরা পালিয়ে যান।
আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মানিক ও আবদুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। রবিন ও হৃদয় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামি সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা সারোয়ার হোসেন বাবলা ও অন্যদের হত্যার জন্য নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে প্রাইভেট কারটির পিছু নেন। গুলিতে আহতদের আত্মীয়দের সন্দেহ সরোয়ার হোসেন বাবলাকে টার্গেট করেই প্রতিপক্ষ ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা ওই গাড়িতে হামলা চালায়।
জানা গেছে, ছোট সাজ্জাদ ও সারোয়ারের দ্বন্দ্ব পুরোনো। চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রবিন জানান, সম্প্রতি সাজ্জাদের গ্রেপ্তার এবং রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দু’জনের মধ্যে ঝামেলা বেড়েছে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে এ হামলা চালাতে পারে।
নিহত আবদুল্লাহর মা রাশেদা বেগম বলেন, ছোট সাজ্জাদ মাস দুয়েক আগে রাউজানে তার ছেলের পায়ে গুলি করে। এতে দুই মাস আব্দুল্লাহ ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ঈদের শপিং করার জন্য দুই মাস পর ওই দিন বের হয়েছিলেন আবদুল্লাহ।
জানতে চাইলে সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না বলেন, আমি একজন ২ মাসের সন্তান সম্ভাবা। আমাকে অকারণে হয়রানি করে মানসিকভাবে যন্ত্রণায় রাখা হচ্ছে। আমার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী ২১ দিনের রিমান্ডে আছে ডিবি অফিসে। তার পক্ষে কোনো তথ্য সরবরাহ করা কি সম্ভব? ধরে নিলাম আমার স্বামী সন্ত্রাসী, কিন্তু আমি কী দোষ করেছি? আমিও সন্ত্রাসী। আমার মা আইসিইউতে আমি সেখানে যেতে পারছিনা। আমার স্বপ্ন আমি আইনজীবী হব। সামনে বার কাউন্সিলে পরীক্ষা আছে। পড়াশোনাও করতে পারছিনা। আমার অপরাধ একজনকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। তিনি বলেন, সব গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে আমার স্বামীকে ধরিয়ে দেওয়ায় নাকি প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার স্বামীকে তো সরোয়ার ধরিয়ে দেয়নি। ধরিয়ে দিয়েছে সূচী নামে এক মেয়ে। বালু মহালে বড় সাজ্জাদ ও সরোয়ার ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সেখান থেকে এই ঝামেলার সৃষ্টি হয় বলে আমি জানতে পারি।
বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। অন্য ৫ জন সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছেন। এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এই মামলায়। তবে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ জুলাই চান্দগাঁও থানা পুলিশ সাজ্জাদকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে। ৫ আগস্টের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তিনি হাটহাজারীর শিকারপুরের মো. জামালের ছেলে। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর নগরের অক্সিজেন এলাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে গেলে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যান তিনি। এতে পুলিশসহ পাঁচজন আহত হন।
গত ২৯ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে সাজ্জাদ বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে পেটানোর হুমকি দেন। পরদিন সাজ্জাদকে ধরতে নগর পুলিশ কমিশনার পুরস্কার ঘোষণা করেন। তার বিরুদ্ধে ১৬টি হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।
গত ১৫ মার্চ সাজ্জাদকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে সিএমপি। এরপর তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না লাইভে এসে গ্রেপ্তারে জড়িতদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। একইসঙ্গে তিনি কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে স্বামীকে মুক্ত করে আনার কথা বলেন। যদিও তামান্নার দাবি, পুলিশ সেই ভিডিও তাকে দিয়ে করিয়েছে।
সাজ্জাদের স্ত্রীর পর সাজ্জাদের নানি রেহেনা বেগমও তার নাতির প্রতিপক্ষকে মারার হুমকি দিয়েছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে গোপনে মারতাম, এখন ওপেন মারব। এ বিষয়ে সাজ্জাদের স্ত্রী বলেন, নাতি কাছে না পেয়ে নানি দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাই তিনি উল্টোপাল্টা বলছেন। একজন বৃদ্ধ মানুষ কাউকে কি মারতে পারে।
মনির/মাহফুজ