রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে কয়েক দিন ধরে তাপপ্রবাহ বইছে। ভোর কিংবা রাত- গরমের তেজ কিছুতেই কমছে না। ভ্যাপসা গরমের কারণে রাজশাহী জেলার পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হচ্ছে, গরম অনুভূত হচ্ছে বেশি।
রাজশাহীতে বৃহস্পতিবার (১২ জুণ) বেলা ৩টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র রোদ ও তাপপ্রবাহের কারণে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। যদিও এমন অবস্থা থাকবে আরও কয়েক দিন। আগামী ১৭ জুনের আগে এ অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। ১৭ জুনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তখন কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাজশাহীতে সর্বশেষ ৩ জুন ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর পর থেকে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। আকাশে মেঘ জমলেও পরে আর বৃষ্টি হয়নি। রাজশাহীতে ঈদের দিন থেকে মৃদু তাপপ্রবাহ বইতে শুরু করে। ঈদের দিন ৭ জুন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরদিন ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবার বেলা ৩টায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ থাকায় গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে।
এদিকে প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। রাজশাহীর নিউ মার্কেট এলাকার ভ্যানচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এই গরমে রিকশা চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। ছুটির দিনে লোকজন কম থাকলেও গরম এতটাই যে জামা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তারপর রোদে সেই ঘাম শুকাচ্ছে। এমনটি হচ্ছে বারবার। কিন্তু কাজ না করলে খাব কী?’
নগরীর শালবাগান এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক আরমান হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রিকশা চালাতে গেলেই মুখ শুকিয়ে আসে। প্রচণ্ড ঘামে শরীর ভিজে যায়। তাই বাসা থেকে পানি এনেছি। স্যালাইন আর শরবত বানিয়ে পান করছি। গরমে অন্য কিছু খাওয়ার ইচ্ছা থাকে না। পেট চালাতে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়।’
রাজশাহীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘এমন গরমে বাতাসও যেন আগুন! ছুটির দিনে রাস্তায় যানজট নেই। তবে বাসে উঠলেই দম বন্ধ লাগছে। বৃষ্টি না হলে এই গরমে টিকে থাকা কঠিন।’
আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক জানান, কয়েক দিন ধরেই দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বেশির ভাগ এলাকায় মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে। ১৭ জুনের পর থেকে সারা দেশে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে প্রচণ্ড গরমের কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের বেশির ভাগই জ্বর, সর্দি, কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গরমের কারণে ডায়রিয়ার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। রোগী বেড়ে যাওয়ায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের আলাদা করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের (শিশু ওয়ার্ড) বারান্দায় ভর্তি করা হয়েছে জেলার পুঠিয়া উপজেলার ভাল্লুকগাছি ইউনিয়নের বাঁশবাড়ি গ্রামের এক বছর বয়সী শিশু জিসানকে। প্রচণ্ড গরমের কারণে হঠাৎ শিশুটি বমি ও পাতলা পায়খানা করতে থাকে। শিশুটির চাচা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার থেকে বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হলে জিসানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় বারান্দায় রেখেছি।’
বহির্বিভাগে শিশু আফিফাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন হালিমা খাতুন। তিনি জানান, তার বাচ্চার বয়স দেড় বছর। কয়েক দিন ধরে সর্দি-কাশি ও জ্বরে ভুগছে। এলাকার ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাইয়েছেন। কিন্তু সুস্থতা আসেনি। তাই সরকারি হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু এখানে এসে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আবহাওয়াজনিত কারণে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে গরমজনিত ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বেড়েছে। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক অবজারভেশন রুম করা হচ্ছে। যদিও এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত কোনো হিটস্ট্রোক রোগী পাওয়া যায়নি। তবু আমরা প্রস্তুত আছি।’