খাঁচা সদৃশ একটি গাড়িতে চার শিশুকে নিয়ে শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো এক মায়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাড়া দিয়েছিল হাজারো হৃদয়কে। ঠাকুরগাঁও শহরের রাস্তায় চলতে থাকা জান্নাতের সেই নিষ্পাপ মুখের ছবি ও জীবনের গল্প স্থান পেয়েছিল খবরের কাগজের পাতায়। আর সেই সংবাদই বদলে দিয়েছে মোছা. জান্নাত আক্তারের জীবন।
জান্নাতের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায়। পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল মোহাম্মদ হাবিল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি জান্নাতের স্বামী হলেও দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ ছিলেন। জান্নাত ছিলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী। স্বামীর অনুপস্থিতিতে একা চারটি সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। ঠাকুরগাঁও শহরের পরিষদপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় সন্তানদের নিয়ে অতিকষ্টে দিন কাটছিল তার।
এর পর ঠাকুরগাঁও শহরের ব্যস্ত সড়কে খবরের কাগজের চোখে পড়ে যায় সেই ভ্রাম্যমাণ গাড়ির খাঁচার ভেতর জান্নাত ও তার সন্তানদের জীবনসংগ্রাম। এই করুণ গল্প 'খাঁচার গাড়িতে ৪ সন্তান, পথে পথে মায়ের কান্না' শিরোনামে গত ১৭ জুলাই খবরের কাগজ- এ প্রকাশের পর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। বহু মানুষ ফোন করেন, খোঁজ নেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
জান্নাত বলেন, 'আমি কখনো ভাবিনি, কেউ আমার কষ্ট দেখে সহানুভূতি দেখাবে। আমি শুধু চাইছিলাম সন্তানদের মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে। এখন মানুষ আমাকে টাকা পাঠাচ্ছে, খোঁজ নিচ্ছে। আমি কৃতজ্ঞ- সবাইকে সালাম ও দোয়া দিচ্ছি।
জান্নাত জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখেরও বেশি টাকা সহায়তা এসেছে তার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (পার্সোনাল: ০১৯৮৮৯০১২৯৭)।
তবে শুধু আর্থিক সাহায্যই নয়, এই গল্প বদলে দিয়েছে তার পারিবারিক বাস্তবতাও:
জান্নাতের স্বামী ও এখন ফিরে এসেছে। তার স্বামী হাবিল বলেন, আমি ভুল করেছি, এটা স্বীকার করছি। সংবাদটি দেখেই আমার হৃদয় কেঁপে উঠেছে। ওর (জান্নাতের) কষ্ট আমি বুঝতে পারিনি। এখন আমি ফিরে এসেছি, বাচ্চাদের সঙ্গে থেকে আবার জীবন গড়তে চাই। আমি সবার কাছে দোয়া ও ক্ষমা চাই।'
তিনি জানান, 'তিনি এখন তার পরিবার নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আর জান্নাতও আর আগের মতো পথে পথে ঘোরেন না।'
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জান্নাতের পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা তাকে একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানের জন্য একটি ভ্যান ও প্রয়োজনীয় মালামাল দিয়েছে। এখন জান্নাত সকাল সকাল ভ্যানে করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করেন।
ওই সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, 'সংবাদটি দেখার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেই, জান্নাতের পাশে দাঁড়াব। শুধু সাহায্য দিলে হবে না, তাকে স্বনির্ভর করতে হবে। তাই তাকে একটি ভ্যান ও দোকানের মালামাল দিয়েছি। এখন সে একজন উদ্যোক্তা। আমরা চাই সে তার জীবনযুদ্ধে জয়ী
হোক।'
মুন্সিপাড়া গ্রামের আফজাল হোসেন বলেন, 'জান্নাতের মতো মানুষেরা সমাজের অবহেলিত অংশ। তারা আমাদের সহানুভূতি ও সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখে। তাকে আমরা কয়েকজন মিলে মোটা অঙ্কের টাকা সহযোগিতা করেছি আমরা তাকে আরও সহায়তার বিষয়ে ভাবছি।'
জান্নাত এখনো একটি ছোট ভাড়া বাসায় থাকেন। তার স্বপ্ন- একদিন একটি নিজের জমি হবে, যেখানে তিনি সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন।
এ বিষয়ে জান্নাত বলেন, 'যদি কেউ আমাকে একটুকরো জমি দিত, দিত একটা ছোট টিনের ঘর, তাহলে আমি নিজেকে সত্যিকারের নিরাপদ মনে করতাম। এখনো প্রতিদিন মনে হয়, কাল হয়তো বাসার মালিক উঠিয়ে দেবে।'
নবীন/মেহেদী/