মো. কোরবান শেখ, বয়স প্রায় ৫২ বছর। থাকেন উত্তরের জেলা গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বাজে ফুলবাড়ি গ্রামে। ব্রহ্মপুত্র নদের এ চরেই বাপ-দাদার সঙ্গে বেড়ে উঠা তার। ধান, পাট, ভুট্টা ও মরিচসহ নানা ধরনের ফসল হতো পূর্বপুরুষদের ২০ বিঘা জমিতে। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে গত ৮ বছরে ২০ বিঘার প্রায় সবটাই বিলীন হয়েছে। বাজে ফুলবাড়ির চরের পশ্চিমাংশে এখন ৬ শতাংশ জমির ওপর কয়েকটি ঘর তুলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন মো. কোরবান শেখ। জমি বলতে নিজের ৩ শতাংশ আর এলাকার মানুষজনের দেওয়া আরও ৩ শতাংশ। এখন কীভাবে সংসার চলছে এ প্রশ্নের জবাবে মো. কোরবান শেখ বলেন, ‘হাটে হাটে মরিচ বেচাকেনা করে যা পাই তা দিয়েই এখন সংসার চলে। তা ছাড়া ছোট ছেলে সুজন মিয়া এখন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কিছু আয় করে। তাতে কিছুটা উপকার হয়। তবে বড় ছেলে হাফেজ রাজু এখনো বেকার।’ পৈত্রিক জমি থেকে বছরে কত মণ মরিচ পেতেন এ প্রশ্নের জবাবে কোরবান শেখ বলেন ‘কমপক্ষে ২০ মণ, শুকানোর পর তা হতে ৪ মণ কখনো কখনো সামান্য বেশি।’
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বাজে ফুলবাড়ি গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার নিঃস্ব হয়েছে গত ৮/৯ বছরে। ওই সব পরিবারের জমি ছিল ১৫ বিঘা থেকে ২০ বিঘা পর্যন্ত। কোরবান শেখ জানান, এখন অনেকেই তার মতো ভূমিহীন।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম অভাবী জেলা কুড়িগ্রাম। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর ভাঙন আর বছর বছর বন্যা কুড়িগ্রামে সব ধরনের উন্নয়নের বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের পূর্ব গোবিন্দপুর গ্রামে থাকেন শওকত আলী ও তার স্ত্রী ছলিমা বেগম। তাদের ৩০ বছরের দাম্পত্য জীবনে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কারণে বাড়ি-ঘর সরিয়েছেন অন্তত ১০ বার। কয়েকদিন আগে ওই নদে পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাঙন শুরু হলে তারা আবার তাদের বসতবাড়ি হারান। ৬ সদস্যের এ পরিবারটি এখন থাকে চরপার্বতীপুর গ্রামে অন্যের জমিতে।
সংসার চলছে কীভাবে-এ প্রশ্নের জবাবে শওকত আলী বলেন. ‘নদী ভাঙনে নিঃস্ব সাধারণ মানুষের বেশির ভাগই অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালান, আমার সংসারও চলছে সেভাবেই।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিভিন্ন সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, কুড়িগ্রামে প্রতি বছর নদীভাঙনে বাড়িঘর হারায় গড়ে ২ হাজার পরিবার। কুড়িগ্রামে এবাব বাড়িঘরের পাশাপাশি ভার মুখে পড়েছে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর ভাগবতীপুর এলাকায় একমাত্র মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এ ছাড়া পূর্ব গোবিন্দপুর এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৫শ ফুট এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়েছে অন্তত ২৫টি পরিবারের। কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে থাকেন আদম আলী, বয়স অন্তত ৬০ বছর। কত বার বাড়িঘর সরিয়েছেন এ প্রশ্নের জবাবে আদম আলী বলেন, ‘তা ১৫ বার তো হবেই পুরাতন ভিটা-মাটির মায়া কাটাতে পারিনি তাই ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই পড়ে আছি এখনো।’
কুড়িগ্রামে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের ভাঙনে ১৫ হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছেন। এ বছর শুধু ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৪৪৭টি পরিবার বাড়িঘর হারিয়েছে। এ ছাড়াও রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী উপজেলার সোনাপুরে শতাধিক পরিবার বসতবাড়ি হারিয়েছে। রাজারহাট উপজেলায় তিস্তার ভাঙনে ৬৩টি পরিবার এবং ফুলবাড়ি উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে ৬টি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছে। এসব পরিবার অন্যের জমি, বাঁধ আর রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে।
মো. আমিরুল ইসলাম কাজি, বয়স ৮৫ বছর। থাকেন পূর্ব বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটফুলবাড়ীতে অন্যের জমির ওপর ঘর তুলে। যমুনার ভাঙনে তার পরিবার এখন একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তিনি জানান, দাদা বাসতুল্লা ফকিরের ৪শ বিঘা জমি ছিল আর বাবা আব্দুর রহমান মাস্টারের ছিল ৩৫০ বিঘা জমি। যমুনার ভাঙনে গত ৩০ বছরে জোতদার থেকে ভিখারি হয়েছেন মো. আমিরুল ইসলাম কাজি। এখন সংসার চলে কীভাবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর ধরে নৌকা চালাই যমুনায়, তাতে দিনে আয় কখনো ৪০০ টাকা, কখনো বা ৫০০ টাকা। এ দিয়েই ৭ জনের সংসার চলে। ‘কী শর্তে নৌকা ভাড়া নিয়েছেন এ প্রশ্নের জবাবে আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘তেলের খরচ বাদে যা রোজগার হয় তার ৭৫ শতাংশ পান নৌকার মালিক আর আমি পাই ২৫ শতাংশ।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসই) মো. আরিফুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে তীর সংরক্ষণে স্থায়ী এবং অস্থায়ী নানা ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের ফলে ভাঙন কমেছে। তবে অরক্ষিত এলাকাগুলোতে এখনো ভাঙন আছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী প্রতি বছরই ডান দিকে সরে আসছে জানিয়ে মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই দুই নদ-নদীর ডানতীরে অরক্ষিত এলাকায় বছরে গড়ে ৪৫০ বর্গফুট জায়গা নদীতে বিলীন হয়। এতে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে। শুধু বগুড়াতেই যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে কমপক্ষে এক হাজার বিঘা জমি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জে রয়েছে পদ্মা, মহানন্দা আর পাগলা বড় নদী। পদ্মা ছাড়া অন্য দুই নদীর ভাঙন তেমন নেই। তবে গোমস্তাপুর উপজেলায় মহানন্দায় কিছুটা ভাঙন আছে তবে পদ্মার মতো নয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবিব জানান, পদ্মার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি এলাকা বিলীন হয় শিবগঞ্জ এবং সদর উপজেলায়।
তিনি বলেন, ‘পদ্মার ভাঙনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বছরে ২৫০ বিঘা থেকে ৩০০ বিঘা পর্যন্ত আবাদি জমি নষ্ট হয়। আর কমপক্ষে ৪০০ বাড়ি-ঘর স্থানান্তর করতে হয়।’