রংপুরের তারাগঞ্জের থানা রোডের কসমেটিকসের দোকানের সামনেই তপ্ত রোদে জুতা সেলাইয়ের কাজ করছে জয় রবিদাস। এখানেই পাঁচ বছর জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন মব কিলিংয়ের শিকার জয়ের বাবা রূপলাল দাস। গত ৯ আগস্ট ওই উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় মব সৃষ্টি করে বিনা দোষে হত্যা করা হয় রূপলাল দাসকে। জয় রবিদাসের এখন স্কুলে থাকার কথা থাকলেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বোনের বিয়ে, ভাইয়ের পড়াশুনাসহ পরিবারের খরচ সামলাতে তাকে এখন বসতে হয়েছে বাবার আসনে।
জয় রবিদাস তারাগঞ্জ ও/এ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শিক্ষাজীবনে সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত সে। হঠাৎ বাবা না থাকায় বিপাকে পড়েছে জয়। সংসারের চাপে বাবার পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে সে। বাবার স্মৃতি বারবার মনে পড়ায় জুতা সেলাইয়ের কাজে বসলেও মন বসাতে পারছে না সে।
রবিবার (৩১ আগস্ট) তারাগঞ্জ বাজারে গিয়ে কথা হয় জয়ের সঙ্গে। জয় বলে, ‘তারাগঞ্জের বুড়িরহাটে মব সৃষ্টি করে আমার বাবাকে বিনা দোষে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অভাবের তাড়নায় আমি কাজ করা শুরু করছি। পড়াশোনা বাদ দিয়ে এখন কাজ করছি। আমার বোনের বিয়ে দিতে হবে, তাই টাকা উপার্জন করতে হচ্ছে। আগে আমার বাবা একাই কাজ করত, ছয়জনে খাইতাম তাই, আগে থেকেই রডের কাজ করে পড়াশোনা করি।’
বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জয় রবিদাস বলেন, ‘এখন কাজে মন বসছে না। এই দোকানে বসেই আমার বাবা কাজ করত যখন মনে পড়ে, তখন মন ঠিক থাকে না। আমার বাবা এদিক দিয়ে ঘোরাঘুরি করতো অনেক কিছুই মনে পড়ে। যার জন্য কাজে মন বসাতে পারছি না।’
জয় আরও বলেন, ‘এই কাজে তেমন আয় নাই। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জুতা সেলাই করি। আয় হয় ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। বর্ষাকাল হাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কাজ করায় মাঝে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ফলে আয়ের সুযোগ কম। তারপরেও সংসার বাঁচাতে এই কাজ করতেই হবে। আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
ওই মার্কেটের কসমেটিকের দোকানি মহিমা রঞ্জন বলেন, ‘রূপলাল খুব ভালো মানুষ ছিল। প্রতিদিন আমার দোকান খুলি দেয়। নির্দোষ ছেলেটাক মারি ফেলাইলো। ওইদিন বিকেলে কাজ বন্ধ করি চলে গেছে। পরদিন বিয়া হওয়ার কথা। রাইতোতে এই ঘটনা।’
ওই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদ হাসান বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমাদের এক বন্ধু জয়ের বাবা মারা গেছেন। ফলে আমার বন্ধু চাপে পড়ে গেছে। তার বাবা মুচির কাজ করত। যেহেতু বাবা নাই, সংসার চালাতে এখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে মুচির কাজ বেছে নিয়েছে সে। আমরা চাই, আমাদের বন্ধু আবার স্কুল আসুক। ও খুব ভালো ছাত্র। তাই ওর জন্য সরকারি-বেসরকারি সাহায্য কামনা করছি।’
জয়ের বন্ধু মাহামুদুল হাসান বলেন, ‘জয়ের বিষয়ে অনেকদিন ধরে শুনছি। ওর বাবা থাকতে বোনের বিয়ের খরচ যোগাতে স্কুলের পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজ করত।’
তারাগঞ্জ ও/এ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক মো মুছা সরকার বলেন, ‘জয়ের বাবা মবের হাতে নিহত হয়েছেন। তার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। তার ভাই বোন আছে, তাই সে তার বাবার পেশা বেছে নিয়েছে। আমি চাই সে আমাদের স্কুলে ফিরে আসুক, পড়াশোনা করুক। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’
নিহত রূপলালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী মালতী রবিদাস বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, ‘সুখের মুখত আসি ভগবান সুখ কাড়ি নিবে স্বপ্নেও ভাবো নাই। ছাওয়া জুতা সেলাই করি ১৫০/১০০ টাকা পায় তাতে সংসারে চলে না। জয়ের বাবা নিহতের পর ছেলে এখন দোকানে যাচ্ছে। পেট না বাসলে পড়াশোনা হবে না। আমার ইচ্ছা ছেলে-মেয়েকে ঠিকভাবে পড়াশোনা করাবো। যাতে করে নিজের পায়ে নিজেরাই দাঁড়াতে পারে। বাবা না থাকায় ও দোকানে গেছে। আয় দিয়ে যে সংসার চলবে সেটা সম্ভাবনা নাই। সেলাইয়ের কাজ ছাড়া আর কিছুই জানে না। মেয়ের বিয়ে, সংসার চালানো, সব মিলিয়ে বিপদে পড়ে গেছি।’
রূপলালের মেয়ে নুপুর রবিদাস বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বাধ্য হয়ে জুতা সেলাই করতে যাচ্ছে। তার রোজগার দিয়ে সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যায়। আমার বিয়ে, ওদের সংসার চালানোতে ওর পড়াশোনা সম্ভব নয়। আপাতত আমাদের বাড়িতে সমস্যা তাই ও দোকানে গেছিল। ও আসলে সব কাজ পারে না। সবাই যদি আমাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করে এবং আমাদের দায়িত্ব নেয় তাহলে ও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারবে, সংসারও চলবে।
রূপলালের মা লাছিয়া রানী রবিদাস বলেন, ‘আমার বুকের ধন চলি গেইছে, সংসারত কেউ নাই, খাই কি। বাধ্য হয়ে নাতি দোকানে গেইছে। মানুষ যখন বাপের কথা আসি কয়, এটা নিয়ে নাতির কষ্ট হয়। ওইটুকু কাজ না করলে, না খায়া মারা যাইবে।’
এর আগে গত ৯ আগস্ট রাতে অজ্ঞানপার্টি সন্দেহে উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলী এলাকায় ভ্যানসহ দুইজনকে আটকের পরে তাদের কাছ থেকে পাওয়া চোলাই মদ ও বিভিন্ন ওষুধ পান স্থানীয়রা। এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। এক পর্যায়ে গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন তারা। পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে তারাগঞ্জ হাসপাতালে নেয়। সেখানে আহত রূপলাল রবিদাসকে (৪০) মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে মারা যান প্রদীপ লাল (৪৫)।
এ ঘটনায় রূপলালের স্ত্রী মালতি রানী ওরফে ভারতী রানী অজ্ঞাত ৫০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরই মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করার কথা বলেছে পুলিশ।
তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল রানা বলেন, ‘আমরা উনাদেরকে ডেকেছি। এর আগে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ডিসি স্যারের নির্দেশনা আছে, তাদের কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। আমাদের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
সেলিম সরকার/সুমন/