চারপাশে পূজার আগমনী বার্তা নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ঢাক-ঢোল ও খোল-করতালের চাহিদা। পূজার এই অবিচ্ছেদ্য সুর তৈরি ও মেরামতের কারিগরদের এখন দম ফেলারও ফুরসত নেই। এমনই এক কর্মব্যস্ততার সাক্ষী ফটিকছড়ির বিবিরহাটের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘মোহন বাঁশি সুর তাল তরঙ্গ’।
প্রায় ৫৫ বছরের পুরনো এই দোকানে এখন দিন-রাত হাতুড়ি আর বাটালির ঠুকঠাক শব্দ শোনা যাচ্ছে। গত প্রায় এক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মন্টু দাশ ও তাঁর দুই সহকারি একটানা কাজ করছেন। চট্টগ্রাম শহর, হাটহাজারী ও রাউজানসহ দূর-দূরান্তের বাদক ও শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্রের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে এই দোকান।
মন্টু দাশ বলেন, 'এখন দিন-রাত বলে কিছু নেই। সকাল ৯টা থেকে শুরু করে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ চলছে। পূজার আগে ৩০টির বেশি ঢোল ও তবলা সারাইয়ের কাজ রয়েছে।'
তিনি আরও জানান, পূজা উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে ঢোল এবং তবলা-ডুগির।
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের আত্মিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে স্বনামধন্য ভান্ডারি গায়ক শিমুল শীল জানান, আমার সঙ্গীত জীবনের শুরু মোহন বাঁশির একটি বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। এখানকার সুরের যে আবেদন, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবের প্রাণ হলো ঢাক-ঢোলের শব্দ। আর সেই শব্দের প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায় মোহন বাঁশির কারিগরদের হাতে।
তবে এই উৎসবের ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর শঙ্কা। মন্টু দাশ বলেন, 'একটা সময় এত বেশি কাজ পেতাম যে রাত দুটো-তিনটা বেজে যেত। এখন এলাকা ভিত্তিক অনেক দোকান হওয়ায় কাজের চাপ কিছুটা কমেছে।'
এই শিল্পের সংকট আরও গভীর। কারিগর রঞ্জন দাশ জানান, প্লাস্টিকের কেসিং দেওয়া ঢোলগুলো বেশি টেকসই হওয়ায় তাঁদের তৈরি যন্ত্রের চাহিদা কমছে। এছাড়া, যাতায়াতের সমস্যার কারণেও আগের মতো লোকজন আসতে চান না।
ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের কদর কমে যাওয়ার পেছনে আধুনিকতাকে দায়ী করছেন অনেকেই। ফটিকছড়ি উপজেলা শিল্পকলা শিশু একাডেমির গানের শিক্ষক লিটন সূত্রধর বলেন, 'ডিজে পার্টিরমত অপসংস্কৃতির কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের আবেদন হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় বাধ্যযন্ত্র আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এর আবেদন কমে যাচ্ছে।'
নাজমুল আলম/মৌসুমী/