চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালসহ (সিসিটি) বন্দরের কোনো অংশ বিদেশিদের ইজারা না দেওয়ার দাবিতে বছরখানেক ধরেই বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করছে। তবে বন্দর রক্ষার আন্দোলনে সংগঠনগুলোর শুরুর দিকের উদ্দীপনা দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়েছে। দেখা দিয়েছে বিভক্তি, যা সংগঠনগুলোর নেতারাও স্বীকার করে নিয়েছেন।
গত সোমবার বন্দরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সদস্য (প্রকৌশল) কমোডর কাওছার রশিদের সঙ্গে বৈঠক করেন বন্দর রক্ষা পরিষদ ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতারা। দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া দেড় ঘণ্টার বৈঠকে এনসিটি, সিসিটিতে বন্দর কর্মচারীদের স্বার্থহানি হয় এমন কিছু না হওয়ার আশ্বাস দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে সন্ধ্যার অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করে বন্দর রক্ষা পরিষদ। অন্যদিকে একই দিন বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে পূর্বঘোষিত ২৬ নভেম্বর সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচির বিষয়ে অনড় থাকে স্কপ নেতারা। এখানেই বন্দর রক্ষার আন্দোলনে সংগঠনগুলোর বিভক্তির আঁচ পাওয়া যায়।
বিভিন্ন সময় বন্দর এলাকায় এনসিটি, সিসিটি রক্ষার আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকটি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা আন্দোলনে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কেউ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, কেউ নীরব ভূমিকা পালন করছেন। আবার আন্দোলনকারীদের মধ্যে যারা বন্দরের শ্রমিক আছেন তাদের অনেকে চাকরি হারানোর ভয়ে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন না, অনেকে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। তবে সবার একটাই দাবি, সিসিটি-এনসিটি বিদেশিদের ইজারা দেওয়া চলবে না।
লালদিয়ার চর ও পানগাঁও ইজারা দেওয়ার দিন অর্থাৎ গত ১৭ নভেম্বর বিডার প্রধান নির্বাহী আশিক চৌধুরী সাত দিনের মধ্যে এনসিটির চুক্তি হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেটি ঠেকাতে আন্দোলনকে বেগবান করতে নতুন করে মাঠে নেমে কর্মসূচির বিষয়ে ভাবছে চট্টগ্রাম বন্দর সুরক্ষা কমিটি। পাশাপাশি স্কপের বন্দর অবরোধ কর্মসূচিতে তারা অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে মঙ্গলবার রাতে বৈঠক করে সংগঠনটি। অন্যদিকে অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করে আলাদা কর্মসূচি দিয়েছে বন্দর রক্ষা পরিষদ। সংগঠনটি বুধবার সন্ধ্যায় মশাল মিছিলের কর্মসূচি দেয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। সেগুলো হলো, চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এর মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে লাভজনক। টার্মিনালটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। চলতি বছরের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বন্দরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ৭ জুলাই নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ভার বুঝে নেয়।
চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এম এ হাশেম রাজু বলেন, ‘বন্দর রক্ষার জন্য আমরাই সর্বপ্রথম কর্মসূচি শুরু করেছি। আমরা একটি সিন্ডিকেটমুক্ত বন্দর চেয়েছি। আমাদের বন্দর আমাদের থাকবে, এটাই আমাদের দাবি। বন্দরের ওপর বিদেশিদের চোখ পড়েছে। আমরা এই জায়গা থেকে মুক্ত হতে চাই। কিন্তু গত দুই মাসে এই আন্দোলনে বিভাজন তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কিছু লোক এখানে জড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে সমস্যাটা হচ্ছে। আন্দোলন সংগ্রামের যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য আমাদের ছিল সে জায়গাটা অনেকটাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।’
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় সদস্য আনোয়ারুল আজিম রিংকু বলেন, ‘আমরা এখন কোনো কর্মসূচি দিতে চাই না। তবে বন্দরের অনেক শ্রমিক স্কপে যোগ দিয়ে আন্দোলন করছে। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, দয়া করে এনসিটি কাউকে দেবেন না। এটার জন্য যা যা করতে হয়, আমরা সেটাই করব।’
তবে বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য ও বন্দর রক্ষা পরিষদের সদস্যসচিব হুমায়ুন কবীরের দাবি, ‘সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভাজন আগে ছিল। বরং আগের চেয়ে আমরা এখন আরও সুসংগঠিত হয়েছি। কিন্তু আমরা বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। চাকরি যাওয়ার হুমকি আসছে।’
স্কপ চট্টগ্রামের যুগ্ম আহ্বায়ক রিজওয়ানুর রহমান খান বলেন, ‘স্কপ গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলনে এখন দেশের শ্রমিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়েছে। আমরা আন্দোলন থেকে সরব না।’