শীতের আমেজ ও আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে পাবনায় দুধের চাহিদা বেড়ে গেছে। বাড়তি এই চাহিদাকে পুঁজি করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অসাধু চক্র নকল দুধ তৈরির ‘উৎসবে’ মেতে উঠেছে। বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণে তৈরি এই ‘সাদা বিষ’ আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানে জেল-জরিমানা হলেও কোনোভাবেই থামছে না মরণঘাতী এই বাণিজ্য।
পাবনার দুগ্ধ উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত ফরিদপুর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলা এখন নকল দুধ তৈরির জোনে পরিণত হয়েছে। এই দুই এলাকার ৫০ থেকে ৬০ জন অসাধু ব্যবসায়ী একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ফরিদপুরের ডেমরা বাজার, আরকান্দি এবং ভাঙ্গুড়ার অষ্টমনিষাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে তৈরি হওয়া এই নকল দুধ সরাসরি চলে যাচ্ছে বিভিন্ন নামি ব্র্যান্ডের আউটলেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা বাজারের ৩০ জন, আরকান্দি বাজারের অন্তত ১৩ জন এবং গোপালনগরের মো. শফি এই কারবারের মূল হোতা। এ ছাড়া পারফরিদপুরের দুজন ব্যক্তি এই চক্রের অন্যতম সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি শুধু খোলা বাজারেই নয়, বরং দুধ কোম্পানির কিছু অসাধু কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে নিবন্ধিত সমিতির মাধ্যমেও এই নকল দুধ সরবরাহ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নকল দুধের ঘনত্ব বাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে কস্টিক সোডা, চিনি, লবণ, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল। ফলে সাধারণ ল্যাকটোমিটার দিয়ে এই ভেজাল দুধ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। দুধ তাজা রাখতে মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নকল দুধের এক কারিগর জানান, প্রতি মণ ছানার পানিতে দুই কেজি দুধের ননী, লবণ, খাবার সোডা, সামান্য ইউরিয়া ও কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ভেজাল দুধ। আবার ফুটন্ত পানিতে স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার অয়েল এবং হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের মিশ্রণেও তৈরি হচ্ছে নকল দুধ।
এদিকে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করলেও মরণঘাতী এই কারবার থামানো যাচ্ছে না। ভাঙ্গুড়ার অষ্টমনিষায় মিজান আলী বা বেড়ার জয়দেব ঘোষের মতো ব্যবসায়ীরা ধরা পড়লেও তাদের সহযোগীরা আড়ালে থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চক্রের এক সদস্যের ভাষায়, মাসে ৫-৬ লাখ টাকা আয় হলে সেখান থেকে লাখ টাকা জরিমানা দিলে খুব বেশি ক্ষতি হয় না।
নকল দুধের উৎপাদনকারী ভাঙ্গুড়া উপজেলার মিজান আলী জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল দুধ তৈরি করেন। এজন্য ব্লেন্ডারসহ কিছু সামগ্রী কিনেছেন। এ ছাড়া সয়াবিন তেলসহ কিছু কেমিক্যাল প্রয়োজন হয়। কাজটি অবৈধ জেনেও তিনি তা করে যাচ্ছেন। এসব দুধ তিনি বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। মাঝেমধ্যে ধরা পড়েন, আবার পুরো উদ্যমে কাজ শুরু করেন। ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগরের মো. শফি বলেন, ‘ভেজাল দুধে মুনাফা অনেক বেশি। মাঝেমধ্যে কিছু জরিমানা দিতে হয়, তবে তা লাভের অংশের তুলনায় খুবই সামান্য।’
গত ১৫ জানুয়ারি পারভাঙ্গুড়া এলাকায় নকল পনির তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান। ১২ জানুয়ারি বেড়া উপজেলার পেঁচাকোলা এলাকায় জয়দেব ঘোষ নামের এক ব্যক্তিকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মেলে গত বছরের ২২ জুলাই চাটমোহরে। সেখানে একটি বড় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানির হাব সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ২ হাজার ৫০০ লিটার ভেজাল দুধ জব্দ করা হয়। দুধে ডিটারজেন্ট ও তেল মেশানোর অপরাধে ওই সেন্টারের তিন কর্মকর্তাকে ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একের পর এক অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা, কারখানা সিলগালা ও মালামাল জব্দ করা হলেও শীত আর রমজানের বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে এই চক্রটি আবারও সক্রিয় হয়েছে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. আকসাদ আল-মাসুর আনন সতর্ক করে বলেন, ‘বিষাক্ত এই দুধ পান করলে লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।’
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পাবনার সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান রনি বলেন, ‘দুধে ভেজাল মেশানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং নকল দুধ নির্মূল করতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’