শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারটি বর্তমানে মাদকসেবীদের নিরাপদ আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এতে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসনসংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয়রাও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের সেখানে থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু আবাসনসংকটের কারণে এই নিয়ম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ভবনটি সংস্কার কিংবা পুননির্মাণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জানা গেছে, আশির দশকের শুরুতে এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার বাজিতখিলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। সে সময় কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারসহ অন্য কর্মচারীরা স্টাফ কোয়ার্টারে অবস্থান করেই রোগীদের নিয়মিত সেবা দিতেন। কিন্তু বছরের পর বছর অবহেলা, সংস্কারের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে ভবনটি ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ওই ভবনটি মাদকসেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণরা সেখানে নিয়মিত আড্ডায় বসে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভবনের আশপাশে সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন কক্ষে মাদকসেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, ছাদের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চারপাশ ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম লিচু বলেন, ‘এটি এখন কার্যত মাদকের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। এলাকার তরুণরা নিয়মিত সেখানে যায় বলে শুনছি। রাতের বেলায় বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডও হয়। আমরা চাই, দ্রুত ভবনটি সংস্কার অথবা নতুনভাবে নির্মাণ করা হোক।’
একই এলাকার বাসিন্দা শিবলু মিয়া বলেন, ‘আগে এখানে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা থাকতেন। এখন কেউ থাকেন না। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সামান্য সমস্যায়ও সদর হাসপাতালে যেতে হয়।’
হাসেম মিয়া নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনটি এখন এলাকার মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তরুণ সমাজ আরও বিপথে যেতে পারে।’ সজিব মিয়া নামে আরেকজন বলেন, ‘ভবনটি সংস্কার করে স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার ব্যবস্থা করলে সাধারণ মানুষ অনেক উপকার পাবেন। তখন মাদকসেবীদের আড্ডাও বন্ধ হবে।’
ভবনটি তৈরিতে ব্যয় হওয়া জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না জানিয়ে ওই এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করে। অথচ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন তা ধ্বংসের মুখে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
স্থানীয় শিক্ষক গোলাম মোস্তফা হেলাল বলেন, ‘একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ভবন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হওয়া খুবই দুঃখজনক। এতে তরুণ সমাজ বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবনটি আবার জনসেবামূলক কাজে ব্যবহার করা যায়।’
বাজিতখিলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সামিদুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় স্টাফ কোয়ার্টারটি এখন বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সেখানে কোনো নিরাপত্তা দেয়াল না থাকায় বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। ভবনটি পুনর্নির্মাণ করা হলে স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে অবস্থান করে নিয়মিত সেবা দিতে পারবেন। এতে স্থানীয় জনগণও উপকৃত হবে।’
বাজিতখিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাসান খুররম বলেন, ‘পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকায় সেখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভবনটি সংস্কার বা পুননির্মাণ করা হলে স্বাস্থ্যসেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।’
এ বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক নিরঞ্জন বন্ধু দাম বলেন, ‘স্টাফ কোয়ার্টার পুনর্নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নিরাপত্তা দেয়ালও নির্মাণ করা হবে।’