সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার এখন গরমের দাপটে হাঁসফাঁস করছে। তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেও বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জনজীবন অতিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে পর্যটননির্ভর অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার প্রধান পর্যটন স্পটগুলোতে দিনের বেলায় পর্যটকদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকত এলাকায় দুপুরের পর রোদ ও গরমের কারণে অনেক পর্যটক হোটেলে অবস্থান করছেন, ফলে সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে স্বাভাবিক চাঞ্চল্য কিছুটা কমে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গরমের তীব্রতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিনোদন খাত উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সুগন্ধা সৈকত এলাকার উপহারসামগ্রীর দোকানের মালিক আয়াত উল্লাহ বলেন, ‘পর্যটক থাকলেও তীব্র গরমের কারণে অনেকেই দিনের বেলায় দোকানে ঘুরতে আসছেন না। বিকেল ও সন্ধ্যার আগে তেমন বেচাকেনা হয় না। এতে প্রতিদিনের বিক্রি আগের তুলনায় কমে গেছে।’
সুগন্ধা পয়েন্টে ঝিনুক ও হস্তশিল্প সামগ্রী বিক্রেতা শাহীন আলম বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল। গরম বেশি থাকলে মানুষ সৈকতে কম সময় কাটায়। ফলে দোকানে ক্রেতাও কম আসে। অনেক সময় সারা দিন বসে থেকেও আশানুরূপ বিক্রি হয় না।’ রেস্তোরাঁর মালিক শফিকুর রহমান নয়ন বলেন, ‘পর্যটকের উপস্থিতি কমলে খাবার বিক্রির পরিমাণ কমে যায়, অথচ স্থায়ী খরচ ঠিকই বহন করতে হয়।’
সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও প্রচণ্ড গরমের কারণে ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্ট এলাকায় শত শত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যটকের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঝিনুক ও হস্তশিল্প বিক্রেতা, ডাব ও কোমল পানীয় বিক্রেতা, ঘোড়া পরিচালনাকারী, বিচ বাইক ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার এবং অস্থায়ী দোকানিরা পর্যটকের উপস্থিতি কমে গেলে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েন।
কলাতলী এলাকার পোশাকবিক্রেতা রুবেল হোসেন বলেন, ‘পর্যটকের সংখ্যা একটু কমলেই ব্যবসায় তার প্রভাব পড়ে। এখন গরমের কারণে অনেকে বাইরে বের হচ্ছেন না। এতে বিক্রি কমে যাওয়ায় দোকান ভাড়া ও কর্মচারীর বেতন নিয়ে চিন্তায় আছি।’
সৈকত এলাকার ডাব বিক্রেতা জাকের হোসেন বলেন, ‘গরমে মানুষ ডাব বেশি খায়, কিন্তু রোদ বেশি থাকলে সৈকতে লোকজনই কম থাকে। তাই বিক্রিও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে না। পর্যটক না থাকলে আমাদের আয়ও কমে যায়।’
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। কিন্তু ভ্রমণ প্রবণতা কমে গেলে দূরপাল্লার বাস, পর্যটকবাহী মাইক্রোবাস ও অন্যান্য পরিবহনসেবার যাত্রীসংখ্যা হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শহরের ভেতরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত যান এবং ভাড়াভিত্তিক গাড়ির চাহিদাও কমে যাচ্ছে।
কলাতলী এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে পর্যটকরা আগের মতো দিনে বাইরে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে দুপুরের দিকে যাত্রী একেবারেই কম থাকে। সন্ধ্যার পর কিছুটা ভিড় বাড়লেও সারা দিনের ঘাটতি পূরণ হয় না।’
সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় ট্যুরিস্ট জিপচালক মো. তপন বলেন, ‘অনেক পর্যটক এখন দিনের বেলায় হোটেলেই থাকছেন। আগে সকালে ইনানী, হিমছড়ি কিংবা মেরিন ড্রাইভে যাওয়ার জন্য বেশি বুকিং মিলত। গরম বাড়ার পর সেই সংখ্যা কমে গেছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন নগরীতে আবহাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত গরম দীর্ঘস্থায়ী হলে পর্যটন খাতের সামগ্রিক আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সৈকত এলাকায় ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল বৃদ্ধি, সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রচার চালানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারও মানুষ জড়িত। তাই তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ এবং পর্যটননির্ভর অসংখ্য পরিবারের জীবিকাতেও পড়বে। ফলে গরমের এই পরিস্থিতি পর্যটন অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।’