নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি। দুই দিন (৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি) শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংসহ বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অন্যদিকে বিক্ষোভে নেতৃত্বদানকারীদের বদলি করা হলেও তারা কেউ নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। উল্টো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই বদলিকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ দাবি করলেও বিক্ষোভকারীরা তা মানতে নারাজ। তারা বলছেন, আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে এই বদলি করা হচ্ছে। ৩১ জানুয়ারি চার এবং ১ ফেব্রুয়ারি সাত কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। সামনে আরও অনেক কর্মচারীকে বদলি করা হবে। তবে এসব করে আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যাবে না বলে জানান তারা। বিক্ষোভকারীরা আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতির ডাক এতে বন্দরের কার্যক্রমে আরও বেশি স্থবিরতা নেমে আসবে।
বিক্ষোভকারীরা আরও বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা হলো জাতীয় সংসদ। কিন্তু সংসদের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণকারী এনসিটি টার্মিনাল বিদেশি একটি কোম্পানিকে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তড়িঘড়ি করে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির সব প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এটা রহস্যজনক।
নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি বিক্ষোভকারীরা
এনসিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। চলমান বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন, প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর এবং সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান। তাদের ঢাকার পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে। তবে তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। এর মধ্যে একজন জানিয়েছেন, তাকে যে পদে বদলি করা হয়েছে সেটি পানগাঁওয়ে নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আজকে (রবিবার) সকালে যোগদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমাদের অবমুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনো পর্যন্ত যাইনি। যাব কি যাব না–সিদ্ধান্তটা নিইনি।’
তিনি বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রাম করার কারণে আমাদের বদলি করা হচ্ছে। রবিবার আরও সাতজন লোক ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। আন্দোলন দমন করার জন্য এটা শক্তি প্রয়োগ ছাড়া আর কিছু না। আমরা মনে করি এটা সম্পূর্ণ তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে, এটা তারা অব্যাহত রাখবে। আমরা নিন্দা জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ এর আগেও দুই দফা আমাদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। এবারও একই কাজ করেছে। আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। যদি আমাদের সঙ্গে এ রূপ আচরণ অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রতিদিন আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়বে। আন্দোলন বন্দরের বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে বলে আমরা মনে করি।’
একই সংগঠনের প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমাদের বদলি করা হয়েছে। তবে আমাকে নির্বাচনি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রবিবার আমি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ট্রেনিং (প্রশিক্ষণ) করে এসেছি। এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের অনুমতির বাইরে আমাকে বদলি করার বিধি বন্দর কর্তৃপক্ষের নেই। এটা আইনবিরোধী কাজ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আন্দোলনে আছি। আমাদের বদলি করা হচ্ছে এই আন্দোলনকে দমন করার জন্য। বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেছেন–বদলি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বদলি আমাকে বা খোকনকে কেন করতে হবে? ওখানে অডিটে কোনো পোস্ট নেই। সেখানে আমি গিয়ে কী করব জানি না। তাই বদলি করলেও আমরা যাব কি যাব না–সেটা নিয়ে চিন্তা করব। আমাদের কর্মসূচি চলবে।’ শনি ও রবিবার কোনো কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়নি বলে জানান তিনি।
নতুন করে বিক্ষোভের সূত্রপাত
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এনসিটি রক্ষার আন্দোলনের গতি কমে আসে। তবে গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। সেখানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন, একই সংগঠনের প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর এবং বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান।
শাস্তির হুমকি দিয়ে পরদিন চিঠি চবকের
কর্মচারীরা আন্দোলনে জড়ালে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। গত ৩০ জানুয়ারি বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে দলবদ্ধভাবে মহড়া দিয়ে বিশৃঙ্খলা ও অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য ও পোস্ট দেওয়া যা, আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ। এমন কর্মকাণ্ড বন্দরের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী কাজ। এমন কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।
তারপরেই বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ সিএমপির
চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় এক মাসের জন্য সব ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভা নিষিদ্ধ করেছে নগর পুলিশ (সিএমপি)। গত ৩১ জানুয়ারি রাতে এক গণবিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি বলেছে–বন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, পথসভা ইত্যাদি আয়োজনের ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। যার ফলে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও স্বাভাবিক রাখাসহ জনশৃঙ্খলা, শান্তি নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন বারেক বিল্ডিং মোড়, নিমতলা মোড়, ৩ নম্বর জেটি গেট, কাস্টমস মোড়, সল্টগোলা ক্রসিংসহ অন্যান্য এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর প্রভৃতি বহন ও ব্যবহার এবং যেকোনো ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও পথসভা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগকে আমরা সব সময়ে স্বাগত জানাই। কিন্তু তড়িঘড়ি করে যখন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন রহস্যের সৃষ্টি হয়। যেহেতু কদিন পরই জাতীয় নির্বাচন, তাই স্পর্শকাতর এই চুক্তির বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। এর ফলে চুক্তিপ্রক্রিয়ার চলমান কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা থাকল না।
এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে করা রিট আবেদনের ওপর বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন।
বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করলেও, এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন খারিজ করে রায় দেন।
পরে তখনকার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।
গত বছর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিট করেন।