জীবনের সবটুকু পুঁজি বিনিয়োগ এবং দিন-রাত শ্রম দিয়ে মুরগি লালন-পালন করেও টিকতে পারছেন না ক্ষুদ্র খামারিরা। কারণ পোলট্রিশিল্পের প্রধান উপকরণ মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রক উৎপাদকরা। তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। এখানে দেশের লাখো খামারি অসহায়। এই শিল্প এখন দাদন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে পোলট্রি খামারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, বিশেষ করে প্রান্তিক বা ছোট খামারিরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন।
দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম এই খাত এমন কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, খামারিদের লোকসান, ব্যাংকঋণের অভাব, বার্ড ফ্লুসহ অন্যান্য মহামারির ঝুঁকি এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব।
চট্টগ্রামে দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে চট্টগ্রামে পোলট্রি খামার ব্যবসা করছেন রাজু পোলট্রির রফিকুল ইসলাম। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হতো সরকারিভাবে। বাংলাদেশ বিমান তাদের ‘বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স’-এর মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বাচ্চা উৎপাদন করে বিক্রি করত। তাই দামও কম ছিল। লাভও ভালো ছিল। এখন মুরগির বাচ্চা পর্যাপ্ত, মানুষ খামারও করছেন। কিন্তু ব্যবসাটা ভালো যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো হ্যাচারির মালিকরা সিন্ডিকেট করে এজেন্টের মাধ্যমে মুরগির বাচ্চা বিক্রি করেন। আবার নিজেরাও বিভিন্ন খামারির কাছে বিক্রি করেন। অনেকটা দাদন ব্যবসার মতো হয়ে গেছে এই খাত। কোম্পানির মালিকরা সংখ্যায় কম, তারা একসঙ্গে বসে বাচ্চার দামসহ যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু হাজারও ডিলারের পক্ষে একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই নিয়ন্ত্রণটা পুরোপুরি কোম্পানিগুলোর হাতে চলে গেছে।
তিনি জানান, গ্রামেগঞ্জে একসময় ছোট ছোট খামারি ছিলেন। বেকার যুবকরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই চিত্র পাল্টাতে বেশি দিন লাগেনি। ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারছেন না। তিনি বলেন, এবারের ঈদে মানুষ ব্রয়লার মুরগি কিনেছেন কেজি ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকায়। ক্রেতাদের ধারণা খামারিরা ঈদে অনেক টাকা লাভ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। ঈদের বাজারে যেসব মুরগি আসবে সেই বাচ্চা কিনতে হয়েছে প্রতিটি ৮৫ টাকা করে। ভাবা যায়! ৮৫ টাকায় এক দিন বয়সী একটি বাচ্চা কিনে ওষুধ, খাবার, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ খরচসহ মিলে বিক্রি উপযোগী করতে খরচ পড়ে ২০০ টাকা। যারা ২১০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি করতে পেরেছেন তারা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু এবার ঈদের চার থেকে পাঁচ দিন পর মুরগির দাম কমে ১৬০ বা ১৭০ টাকায় নেমে আসায় অনেককে লোকসান গুনতে হয়েছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক দিন বয়সী একটি বাচ্চা উৎপাদনে খরচ পড়ে ২৭ টাকা থেকে ৩৩ টাকা। তারা স্টাফ বেতন, গাড়ি ভাড়া, অফিস খরচ সব যোগ করে বাচ্চার মূল্য নির্ধারণ করে। তারা ৮৫ টাকায় বিক্রি করলে প্রতিটা ডিমে ৫০ টাকা লাভ করেছেন। অথচ একজন খামারির ১০ টাকা লাভ করতে কষ্ট হয়।
তিনি জানান, সরকারের উচিত খামারি, ডিলারসহ পোলট্রি খাতে জড়িত সব খাত থেকে প্রতিনিধি নিয়ে বৈঠক করে বাচ্চা ও খাদ্যের দাম নির্ধারণ করা। উৎপাদন খরচ যদি ৩০ টাকা হয় তা ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করুক। সারা বছর এই দামে মুরগির বাচ্চা বিক্রি হবে।
দেশে মুরগির বাচ্চার চাহিদা সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও উৎপাদকরা বলেন, প্রতি সপ্তাহে বাচ্চা উৎপাদন হয় দেড় কোটি। কোম্পানিগুলো অনেক সময় এক সপ্তাহ বাচ্চার সংকট তৈরি করে পরের সপ্তাহে দাম বাড়িয়ে দেয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি শুরু থেকে যাদের খামারি হিসেবে দেখে এসেছেন তাদের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে নতুন করে কিছু লোক এই এলেও সিন্ডিকেটের মারপ্যাঁচ না বুঝে নিঃস্ব হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খামারি খবরের কাগজকে বলেন, বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিদিন মুঠোফোনে মেসেজ আদান-প্রদান করে বাচ্চার দাম ঠিক করে। এই মেসেজের ওপর নির্ভর করে মুরগির বাজার। বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চায় না।
অর্ধযুগ ধরে খামারিদের কাছ থেকে মুরগি কিনে দোকানদারের কাছে বিক্রি করেন উত্তর চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গোলাম কদর আজম। তিনি জানান, ব্যবসার শুরুতে উত্তর চট্টগ্রামের দেড় শতাধিক খামারির কাছ থেকে মুরগি কিনে বিভিন্ন বাজারের মুরগির দোকানে পাইকারি বিক্রি করতেন তিনি। তখন তিনি দিনে প্রায় তিন হাজার মুরগি বিক্রি করতেন। এখন তা কমে এক হাজার থেকে দেড় হাজারে নেমে এসেছে। অন্তত ৪০ শতাংশ খামারি লোকসান দিয়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।
তিনি জানান, যেসব খামারি সিন্ডিকেটের কৌশল ধরতে পারে তারা কোনোভাবে টিকে যায়। যেমন ঈদের পর মুরগির বাচ্চার দাম ধীরে ধীরে কমছে। কারণ এখন খামারে যেসব বাচ্চা তোলা হচ্ছে তার বিক্রি হবে কোরবানির ঈদের সময়। সে সময় মুরগির চাহিদা থাকবে না। কোরবানির কিছুদিন পর যখন আশুরাকে লক্ষ্য রেখে খামারিরা মুরগির বাচ্চা তুলবেন তখন আবার দাম বেড়ে যাবে।
মুরগির চাহিদা হ্রাস-বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুচরা বাজারে মুরগির কেজি ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে দাম থাকলে চাহিদা প্রচুর বেড়ে যায়। দাম ১৬০ টাকা পার হলেই চাহিদা কমে যায়। বর্তমানে মুরগির বাচ্চার দাম কমে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাই পাইকারিতে মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। খুচরায় ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। অর্থাৎ গাড়ি ভাড়াসহ চার ধাপ পেরিয়ে একটি মুরগি ভোক্তার কাছে পৌঁছতে ২০ থেকে ২৫ টাকা দাম বেড়ে যায়। কয়েক দিন আগে মুরগির ফিড বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) দাম ছিল ৩ হাজার ২৫৫ টাকা। গত ১ এপ্রিল বস্তায় ১২৫ টাকা বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্যারাগনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম বাড়লে সবাই বলাবলি করেন। কিন্তু যখন আমরা একটি বাচ্চা চার টাকায়ও বিক্রি করতে পারি না। অনেক সময় বাচ্চা মেরে ফেলতে হয়–তখন সবাই চুপ থাকেন। বাস্তবতা হলো দুটি বিষয় নিয়েই ভাবতে হবে। সঠিকভাবে বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করতে পারে না বলে অনেক সময় খামারে রোগ আসে। তখন খামারিরা আমাদের দায়ী করেন। বাচ্চার দাম বৃদ্ধির কারণে খামারিরা নিঃস্ব হচ্ছেন তা নয়।’ এর জন্য তিনি খামারিদের অসচেতনতাকে দায়ী করেন।
একটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ ৩৫ টাকার কমবেশি উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, কোম্পানিগুলো কোনো সিন্ডিকেট করে না। বরং অনেক খামারি ডিলারদের কাছ থেকে বাচ্চা, ওষুধ, খাদ্য বাকিতে নিয়ে যান। তারা ওই ডিলারের কাছ মুরগি বিক্রি করতে বাধ্য হন। কেউ যদি নগদ টাকা দিয়ে বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ কেনেন, সেই খামারি নিজের ইচ্ছেমতো দোকানে মুরগি বিক্রি করতে পারেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক এক মহাপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, দেশের ক্ষুদ্র খামারিরা ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপরিকল্পিত খামার গড়া। দেশে বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করে এমন খামারের সংখ্যা ২০ শতাংশও হবে না। বায়োসিকিউরিটি দুই ধরনের। একটা হলো স্ট্রাকচারাল, অর্থাৎ খামারটির অবকাঠামো এমনভাবে নির্মাণ করা হয় চারদিক থেকে বায়োসিকিউরড। আরেকটি হলো অপারেশনাল, অর্থাৎ ওই খামারে যিনি বা যারা কাজ করবেন তারা খামারে প্রবেশের আগে সব ধরনের জীবাণুমুক্ত হয়ে প্রবেশ করবেন। অথচ দেশের বেশির ভাগ খামার উন্মুক্ত। যে কারণে জীবনের সব পুঁজি বিনিয়োগ করে কোনো খামারি হয়তো এক ব্যাচে লাভবান হন। পরের ব্যাচে মুরগি মারা যায়। অথবা ওজন ঠিকভাবে আসে না। লোকসান গুনতে হয়। এ নিয়ে সরকার, কোম্পানি কিংবা খামারিদের সংগঠকদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান খবরের কাগজকে বলেন, পোলট্রি খাত স্থিতিশীল না হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষুদ্র খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উদ্যোগ নিয়ে কোন মৌসুমে বাচ্চার দাম কত হবে তা ঠিক করে দিতে হবে। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে যারা বাচ্চা এবং খাদ্য উৎপাদন করে তাদের সঙ্গে বসতে হবে। সঙ্গে খামারিদের প্রতিনিধিও রাখতে হবে। তবেই এই খাত স্থিতিশীল হবে। এখন দেখা যায় একসময় হঠাৎ বাচ্চার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আবার একদম এমনভাবে কমে যায়, যা কল্পনার বাইরে। এটি কোনোভাবেই সুখকর নয়।