দেশের চামড়া রপ্তানিকারকদের ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। চীন চামড়া কিনলেও অর্ধেক দামে নিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা হয়েছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। চামড়া খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
চামড়া খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চামড়া খাতের জন্য এতদিন সরকার কোনো সমন্বিত রপ্তানি নীতি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেনি। বর্তমান সরকার চামড়া খাতের সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বহু বছর চেষ্টার পর সিইটিপি নির্মাণ করা হলেও তা নিয়ে সমস্যা কাটছে না। বিগত দুই সরকারের সময়ে চামড়া খাতের সংকট কাটাতে সঠিক পরিকল্পনা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। আর এজন্য চামড়া খাতের সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও দেশে-বিদেশে চামড়া ও চামড়া খাতের বাজার বাড়ছে না।
ট্যানারি মালিকরা জানান, সিইটিপির জরুরি সংস্কার ও পূর্ণসক্ষমতায় পরিচালনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ড সুবিধা বা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সহজ অর্থায়ন করতে হবে। এতে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে দেশের চামড়ার প্রবেশ সহজ হবে, রপ্তানি মূল্য বাড়বে। ফলে চামড়া ও চামড়া খাতের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ হবে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন,‘ এই সরকার কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ সঠিক সময়ে চামড়ায় লবণ দেওয়া হলে তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। দামের ব্যাপারে বায়ারদের সঙ্গে দর কষাকষি করা যাবে। তবে সিইপি পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে। এর কারণে এলডব্লিওজির সনদ পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। চামড়া খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। বিগত দিনে সময়োপোযোগী পরিকল্পনা করা হয়নি।’
পোস্তার চামড়া ব্যবসায়ী মনজুর হাসানও জানান, সিইটিপি কার্যকর না থাকায় শুধু চীনের কাছে বাজার চলে গেছে। কিন্তু তারা দাম দিচ্ছে না। অর্ধেক দামে কিনছে। এ জন্য আগের মতো রপ্তানি বাড়ছে না।’
তবে সরকারের সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই বছরে সিইটিপির ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। পুরোনো স্পেয়ার পার্টস, পাম্প এবং ব্লোয়ার পরিবর্তন বা মেরামত করা হয়েছে। এর ফলে সিইটিপির কিছু কিছু প্যারামিটার এখন বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। আগে কঠিন বর্জ্য নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকলেও বর্তমানে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে সিইটিপির নকশাগত ত্রুটিগুলোর স্থায়ী সমাধান করা হবে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের মাংস ব্যবসায়ী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘একসময়ে এক-দেড় হাজার টাকায় গরুর চামড়ার পিস বিক্রি হলেও চার-পাঁচ বছর থেকে দামই নেই। ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি বিক্রি হয় না। কোরবানির চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়। নতুন সরকার এসেছে ক্ষমতায়। আমাদের প্রত্যাশা যেন চামড়ার দাম বাড়ে।’
পোস্তার চামড়া ব্যবসায়ী মো. আফতাব খান বলেন, রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পর এবারও ঈদে চামড়ার দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ সাভারে ট্যানারি পল্লী স্থানান্তর হলেও সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
অন্য চামড়া ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারকরাও জানান, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ না পাওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ সুযোগে চীন কম দামে চামড়া কিনছে। এর ফলে রপ্তানি বাড়ছে না। চামড়ার দামও বাড়ছে না। তবে এই সরকার চামড়া সংরক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনকে পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।
অন্য বছরের মতো এবারও সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করেছেন ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। খাসির লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির ক্ষেত্রে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ঢাকাসহ সারা দেশে কার্যকর হবে।
দাম নির্ধারণ করলেও গত চার-পাঁচ বছর থেকে কোরবানির ঈদের চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়। কোরবানির পশুর চামড়া মূলত অভাবী, এতিম ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেন কোরবানিদাতারা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সামান্য অসচেতনতার কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। এ পরিস্থিতি রোধে সরকার এবার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কোরবানির একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়।
চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ
আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রম গতিশীল করতে চামড়া ব্যবসায়ীদের অনুকূলে দ্রুত ঋণ বিতরণের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এ খাতের পুরোনো ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কিস্তি আদায়ে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। গত ৫ মে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, চামড়াশিল্প দেশের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী খাত এবং কোরবানির ঈদেই বছরের প্রায় অর্ধেক কাঁচামালের জোগান আসে। এ–জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া, ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও এর বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান, দেশের চামড়া খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের জন্য বিশেষ ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। কিন্তু চামড়া ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ঋণ নিলে তা আর পরিশোধ করতে চান না। এমনকি ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, অনেকে সে সুযোগ নিতেও নারাজ। চামড়া ক্রয়ে গত বছর (২০২৫ সালে) ১২৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। যা ২০২৪ সালে ছিল ২৭০ কোটি টাকা। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ২৫৯ কোটি, ২০২২ সালে ৪৪৩ কোটি, ২০২১ সালে ৬১০ কোটি টাকা, ২০২০ সালে ৭৩৫ কোটি এবং ২০১৯ সালে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। যতই দিন যাচ্ছে চামড়া খাতের ঋণ কমছে।
চামড়ার দাম না বাড়লেও আকাশচুম্বী জুতা-স্যান্ডেলের দাম
কয়েক বছর থেকেই গরুর কাঁচা চামড়ার পিস ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক পিস চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পর ২০ বর্গফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়। তা দিয়ে অন্তত পাঁচ জোড়া জুতা তৈরি হয়। কিন্তু নামিদামি জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এক জোড়া জুতা বিক্রি করছে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায়। তাদের স্যান্ডেলও বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত জুনে কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় গরুর চামড়া কেনা হয়েছে। একটি গরুর চামড়ায় সাধারণত লবণ লাগে ১০ থেকে ১১ কেজির মতো। এভাবে এক পিস চামড়া সংগ্রহ করার পর লবণ দেওয়া থেকে শুরু করে ট্যানারিতে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আসতে খরচ হয় ২ হাজার ৬৫০ টাকা। সব ধাপ শেষ করতে প্রতি বর্গফুট চামড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে খরচ পড়ে ১৩২ টাকা।
চামড়ার আকার বড় বা দাম বেশি হলে প্রতি বর্গফুটে খরচ সর্বোচ্চ ১৪৭ টাকা হতে পারে। মো. কামাল পাশাসহ অন্য চামড়া রপ্তানিকারকরা জানান, বে, বাটা, এপেক্সসহ অনেকেই ভালো কোয়ালিটি নিশ্চিত করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বর্গফুট চামড়া কেনে। সেই চামড়ার জুতা রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকার শোরুমে দেখা যায় ২ হাজার ২৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেল্ট বিক্রি হচ্ছে ৯৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৪৯৯ টাকায়। তবে রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়ে অরিজিনাল চামড়া দিয়ে জুতা-স্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে। তাদের কোয়ালিটিও খারাপ না। অথচ সেগুলোর দাম অনেক কম।
ট্যানারি মোড়ের এসবি লেদারের স্বত্বাধিকারী মো. সানি খবরের কাগজকে বলেন, ‘নামিদামি কোম্পানির মতো আমরাও জুতা তৈরি করি। তা ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্যান্ডেলও দেড় থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ জুতা, স্যান্ডেল ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’ অন্য উদ্যোক্তারাও বলেন, কম দামে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট বিক্রি করা হচ্ছে। সরকার কিছু ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে আরও কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করা যাবে।