ভৈরব-রূপসা নদীর তীরে খুলনা এক সময় ছিল সমৃদ্ধ শিল্পনগরী। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ ছিল বিভিন্ন শিল্প-কারখানা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন চাকরির খোঁজে খুলনায় আসতেন। কিন্তু এ সবকিছুই আজ ইতিহাস। কাঁচামাল সংকট, পুরোনো যন্ত্রপাতি, মূলধনের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই অঞ্চলের দুই ডজনের বেশি বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি বন্ধ শ্রমিকদের। কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এতে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে সামগ্রিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেকারত্ব ও হতাশার এই চিত্র সারা দেশের। গত কয়েক বছরে আর্থিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে দেশে প্রায় ৪০০টি তৈরি পোশাক কারখানা, চিংড়ি ফ্যাক্টরিসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কারখানা বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
তবে চলমান স্থবিরতা কাটাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ১ মে রাজধানীর নয়াপল্টনে শ্রমিক সমাবেশে বিগত কয়েক বছরে বন্ধ হওয়া কলকারখানা পর্যায়ক্রমে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো সচল হলে বেকারত্ব কমবে এবং উৎপাদনমুখী খাতে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলছেন অর্থনীতিবিদরা। সেই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।
পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান বলেন, বিগত সরকারের আমলে লোকসানের কথা বলে খুলনা অঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করা হয়। শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারকে মিলের পুরোনো মেশিনগুলো আধুনিকায়নের (বিএমআরআই) কথা বলা হয়েছে। ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত মিলের মেশিন ১০০০-১২০০ কোটি টাকা হলেই আধুনিকায়ন করা সম্ভব ছিল। মিলের উৎপাদন এতে চার গুণ বৃদ্ধি হতো।
ফলে লোকসানের কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু সদিচ্ছা না থাকায় ২০২০ সালের জুলাইতে সরকারি সিদ্ধান্তে খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধের পর থেকে বেসরকারি উদ্যোগে ইজারার মাধ্যমে কয়েকটি পাটকল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
কারখানা বন্ধ হলো কীভাবে
খুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিলসহ অধিকাংশ বৃহৎ শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে গ্যাস সংকট, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
লোকসানের অজুহাতে একযোগে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হলে ৩০ হাজারের বেশি স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে লোকসানের মুখে পড়ে মিলগুলো। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পুরোনো প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় এক সময়ের লাভজনক খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চরম অব্যবস্থাপনা আর ভ্রান্তনীতির কারণে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, কোরাইশি স্টিল মিলসহ অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল ও চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, খুলনায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ও বিমানবন্দর না থাকায় নতুন কোনো ভারী শিল্প গড়ে ওঠেনি। উপরন্তু পুরোনো বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেন।
কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন
খুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন। খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, আলীম, ইস্টার্ন, স্টার জুটমিল বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৩০ হাজার স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক কর্মহীন হন। নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, টেক্সটাইল মিল, লবণ মিল, চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরও কয়েক হাজার মানুষ কাজ হারান।
বিগত বছরগুলোতে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে উৎপাদন খাতে ব্যাংক জটিলতা এবং বিদেশি ক্রেতার ক্রয়-আদেশ কমে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বর্তমান সরকার বন্ধ কারখানাগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নতুন করে যেন কোনো কারখানা বন্ধ না হয়, সে জন্য রুগ্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কাজ হারানো শ্রমিকদের পরিবারের দুর্দশা
কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর হাজার হাজার শ্রমিক তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বকেয়া পাওনা বুঝে না পাওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে এসব শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবন চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্দশায় পড়েন। নিয়মিত উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ায় অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারকে দিন কাটাতে হয় অর্ধাহারে-অনাহারে। অনেক শ্রমিক তাদের জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে পাওনা টাকা বা সঞ্চয়পত্র তুলতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ছেন। বিশেষ করে অস্থায়ী ও দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকদের পাওনাপ্রাপ্তি নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
প্লাটিনাম জুটমিলের শ্রমিক মোহাম্মদ আজাদ মিয়া জানান, মিল বন্ধ হওয়ার পর কিছুদিন ইজিবাইক চালানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্বল্পআয়ে পরিবারের সদস্যদের দুবেলা দুমুঠো ভাত দিতে পারিনি। বাড়ি ভাড়ার বকেয়া মেটাতে না পারায় আশ্রয় মিলেছে রেললাইনের পাশের বস্তিতে। অর্থাভাবে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ঢাকার গার্মেন্টসে ছোটখাটো চাকরি করে। মিল বন্ধ হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে গভীর হতাশা কাজ করছে। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে বাধ্য হয়ে দিনমজুরির মতো বিকল্প কাজ বেছে নিয়েছেন। অসংখ্য শ্রমিক পরিবার শোচনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
বন্ধ কারখানা চালু হলে পরিস্থিতি পাল্টাবে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫-২৭ লাখের মধ্যে। বিভাগওয়ারি ঢাকা বিভাগের পর চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ লাখ ৮৪ হাজার, রাজশাহীতে ৩ লাখ ৫৭ হাজার, খুলনায় ৩ লাখ ৩১ হাজার, সিলেটে ২ লাখ ১৬ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ৬ হাজার, বরিশালে ১ লাখ ৩৯ হাজার এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ লাখ ৪ হাজার বেকার আছেন। প্রায় এক কোটি আছেন ছদ্ম বেকার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিলগুলো বন্ধ হওয়ায় গত কয়েক বছরে খুলনার খালিশপুর-দৌলতপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ধ মিলকারখানা চালু হলে আবার বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
স্থবির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ লাখ লাখ মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। আবার নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে মৃত শিল্পাঞ্চলগুলোয়। মিলকেন্দ্রিক ছোট-বড় ব্যবসা, দোকানপাট এবং পরিবহন খাত চাঙ্গা হবে।