মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সংকটের তীব্রতা লক্ষ করা গেছে। পেট্রলপাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার চিত্র এখন নিত্যদিনের ঘটনা। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়া ও সরবরাহসংকট–এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। যদিও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক পাম্পেই অকটেন ও ডিজেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সরকারি গাড়িতে মাসিক ভিত্তিতে বরাদ্দ করা জ্বালানির ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমাতে হবে। এ তালিকা থেকে বাদ যাবেন না প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। এ ছাড়া সরকারি কার্যালয়ে সব ধরনের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবাসিক ভবনে শোভাবর্ধন ব্যয় ২০ শতাংশ ও অনাবাসিক ভবনে শোভাবর্ধন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ে এটি একটা ভালো উদ্যোগ।
তীব্র জ্বালানিসংকটে রাইডিং শেয়ারের চালকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। ঈদের পর ঢাকায় ফেরা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও তেল সংগ্রহ করতে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। অনেকের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষিযন্ত্রের জন্য তেল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেচযন্ত্রের বড় অংশ চলে ডিজেলে আর কিছু অংশ চলে পেট্রল দিয়ে। কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রয়োজনমতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচে যেমন সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি ফসল কাটা নিয়েও কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানিসংকটের কারণে কৃষি খাত যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। হাওরাঞ্চলে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত ধান কেটে ফেলা জরুরি; যাতে আগাম পানি চলে এলে ফসলের ক্ষতি না হয়। চলমান ডিজেলসংকটে উপকূলের জেলেসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। তেল যেন এখন সোনার হরিণ।
সারা দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি থাকলেও নানা অনিয়ম, কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। খবরের কাগজের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজবাড়ীতে কীটনাশকের দোকানে মিলেছে ১৮৩ লিটার ডিজেল। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর ও রাজবাড়ীতে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির দায়ে জরিমানা ও জব্দের ঘটনা ঘটেছে। মেহেরপুর প্রতিনিধির তথ্যমতে, তেলবাহী ট্রাক থেকে গোপনে মধ্যরাতে অবৈধভাবে তেল নামানোর সময় সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেলসহ তিনজনকে গাংনী থানার পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। প্রশাসনের অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়লেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বাজার। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে জানানো হলেও বাস্তব চিত্র যা দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে, সরবরাহব্যবস্থার ভেতরে কোথাও না কোথাও অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে তদারকির ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে আরও কঠোর হওয়া জরুরি। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও বিতরণ; সকল পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো ছাড়া এ সংকট কাটানো কঠিন। আপাতত এর কোনো দ্রুত বিকল্প সমাধানও নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সংকট না থাকলে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে। তাই বিদ্যমান সম্পদ ও সরবরাহব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরই জোর দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের সংকট কাটাতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে জ্বালানি খাতের সব প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে পরিকল্পনা করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশ থেকে তেল পাচার হয়ে যাওয়া, অবৈধভাবে তেল মজুত করা, আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা, কর্তৃপক্ষের তদারকির দুর্বলতা- এগুলো কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ফিলিং স্টেশনের মালিকদের তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি। আশা করছি, সরকার দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হবে।