ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পেলের কীর্তিতে ভাগ বসালেন ইয়ামাল জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় প্রথম দফার বৈঠক শেষ, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান ডোকুর ‘বিশ্বকাপ ছাড়ার’ সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর প্রথমার্ধে সৌদি আরবের জালে ৩ গোল স্পেনের তীব্র গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি প্রথম গোলেই ইতিহাস গড়লেন ইয়ামাল সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন সিংগাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু সুরের মূর্ছনায় বিশ্ব সংগীত দিবস: ঢাকার দুই প্রান্তে সুরের বিভা কুড়িগ্রামে এক বাঘা আইড় ৮৫০০০ অজু করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ গেল ৩ মাদরাসাছাত্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় দণ্ডিত ৫৯ জন: আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ‘অসত্য’ বক্তব্য, উত্তপ্ত সংসদ স্পেনের শুরুর একাদশে ইয়ামাল সুফিয়া কামাল ও আবু হেনা মোস্তফা কামালের স্মরণে জবিতে দুই দিনব্যাপী সেমিনার শুরু মানিকগঞ্জে ঝোপে মিলল স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ মালয়েশিয়ায় তারেক রহমান, বাণিজ্য–বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা দিনাজপুরে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ ফি ৫ টাকা নির্ধারণের দাবিতে মানববন্ধন চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ শরীয়তপুরে শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসা শিক্ষক আটক স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়: ইসি সচিব বোয়ালমারীতে শতবর্ষী কালী মন্দিরে ভাঙচুর চাঁদাবাজির অভিযোগে সোনারগাঁওয়ের এমপি পুত্র সজীব আটক প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন তারেক রহমান মাদারগঞ্জে বজ্রপাতে এক বৃদ্ধের মৃত্যু ‘কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নিচ্ছেন’

‘সুরে বাঁধা ভাষা, ভাষায় বাঁধা পৃথিবী’

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
‘সুরে বাঁধা ভাষা, ভাষায় বাঁধা পৃথিবী’
ছবি: সংগৃহীত

একটি অলস শনিবারের সন্ধ্যা। আকাশে মেঘের আস্তরণ, আর টরন্টোর ব্যস্ত ডাউনটাউন যেন একটু থেমে শ্বাস নিচ্ছে—নিজেকে নতুন করে সাজানোর আগে একটুখানি বিরতি। আমি আর আমার বন্ধু তানভীর হোসেন গাড়ি পার্ক করে সেন্ট জোসেফ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। গন্তব্য, কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টার। কিন্তু গন্তব্যের আগে যে শহর নিজেই এক শিল্পকর্ম, সেটাকে উপেক্ষা করা যায় না। পুরোনো ইটের দেয়াল, নিঃশব্দ গাছের সারি, হালকা বাতাসে ভেসে থাকা এক ধরনের রোমান্টিক বিষণ্নতা-সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটা যেন নিজেই এক কবিতা হয়ে উঠেছিল।

গত ২৫ এপ্রিল অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে। কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টারের এই ভেন্যুটি নিজেই এক ইতিহাসের অংশ। সঙ্গীত সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন সৃষ্টিকে সামনে আনার জন্য এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই জায়গাটি শুধু একটি ভবন নয়, এটি কানাডার সংগীতচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে নতুন সুরকারদের কাজ সংরক্ষণ করা হয়, গবেষণা হয়, পরিবেশনা হয়-এক কথায়, এটি সৃষ্টিশীলতার একটি আর্কাইভ এবং প্ল্যাটফর্ম। সেই ঐতিহ্যের ভেতরেই এই আয়োজন যেন এক নতুন অধ্যায় যোগ করল-যেখানে সাহিত্য আর সঙ্গীত একসাথে এসে দাঁড়াল, আর ভাষার সীমারেখা ভেঙে দিল।

দরোজা পেরোতেই আমাদের স্বাগত জানালেন চির হাস্যোজ্জ্বল সুব্রত কুমার দাস, সময় তখন ঠিক পাঁচটা পঞ্চান্ন। এই শহরে বাঙালি সংশ্লিষ্টতায় সুব্রত কুমার দাসের উপস্থিতি যেন এক ধরনের নিশ্চয়তা-এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের মুহূর্ত।

ভিতরে ঢুকেই বুঝলাম-এটা আর পাঁচটা অনুষ্ঠানের মতো নয়। এখানে এক ধরনের উৎসবমুখরতা, কিন্তু তা কোলাহল নয়-একটি বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তেজনা। লেখক ও অনুবাদক তাসমিনা খান তখন ব্যস্ত এনআরবি টেলিভিশনের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে, আর দর্শকেরা  নিজ নিজ আসনে অপেক্ষা করছেন। মঞ্চের এক কোণে শিল্পীরা নিজেদের যন্ত্র ঠিক করছেন, সুর মিলাচ্ছেন-একটি অদৃশ্য সুরের প্রস্তুতি যেন চারপাশে ভাসছে।

তানভীর, তার স্বভাবমতো, চুপচাপ এক কোণে গিয়ে বসে পড়লেন। আর আমি-আমি তো সেই মানুষ, যে নীরবতা ভাঙতে ভালোবাসে। চারপাশে পরিচিত মুখ-কথাসাহিত্যিক জাকারিয়া মোহাম্মদ ময়ীন উদ্দিন, প্রিয় মানুষ নীলিমা দত্ত, সৈয়দা রুখসানা বেগম, শিল্পী ও লেখক সৈয়দ ইকবাল, শ্রেয়সী বোসদত্ত, সুজিত কুসুম পাল, ডক্টর জান্নাতুল নাঈম, কবি জামিল বিন খলিল, আবৃত্তিকার ফ্লোরা নাসরিন ইভা-আরও কত পরিচিত মানুষ, কত গল্প, কত সম্পর্ক। এই সম্প্রদায় আমাদের বেঁধে রাখে এক অদৃশ্য সুতায়-ভাষা, সাহিত্য, আর স্মৃতির বন্ধনে।

এই সুযোগে এই অনুষ্ঠানের সেনাপ্রধান জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক সম্পর্কে দুটো কথা বলে ফেলি। কারণ এই আয়োজনের পেছনে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন-জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক। তিনি শুধুই একজন কবি নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনকার। কানাডার সাহিত্যজগতে তার অবস্থান এমন, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, জাতিগত স্মৃতি এবং সৃজনশীলতা একসাথে মিশে যায়। তিনি কানাডার পার্লামেন্টারি পোয়েট লরিয়েট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার লেখায় আফ্রিকান-কানাডিয়ান ইতিহাস, দাসপ্রথার উত্তরাধিকার, এবং পরিচয়ের জটিলতা বারবার ফিরে আসে।

কিন্তু এই সন্ধ্যায় আমি তাকে আরেকভাবে দেখলাম-একজন সংগঠক হিসেবে, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। বহু বছর ধরে তিনি কবিতাকে গানে রূপ দেওয়ার যে প্রকল্পটি চালিয়ে আসছেন, সেটি কেবল শিল্পের সংমিশ্রণ নয়, এটি সংস্কৃতির এক ধরনের পুনর্গঠন। কবিতার ভাষাকে গানের সুরে, আবার সেই সুর নতুন কণ্ঠে-এই বহুমাত্রিক যাত্রা আমাদের ভাবায়, আমাদের প্রশ্ন করে, আমাদের একত্রিত করে। 

এই প্রকল্প ইতোমধ্যেই বহু সংস্করণের মধ্য দিয়ে গেছে-এটি ছিল বাইশতম আয়োজন। এতদিন এটি সীমাবদ্ধ ছিল শুধু ইংরেজি ভাষার মধ্যেই। কিন্তু এবারই প্রথম অন্য একটি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা। আর আমাদের আনন্দ হলো সেই ভাষাটির নাম বাংলা-এটি কেবল একটি নতুন অধ্যায় নয়, এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। কারণ ভাষা মানে শুধু শব্দ নয়-ভাষা মানে স্মৃতি, ইতিহাস, অনুভব এবং পরিচয়।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য, তিনি সুব্রত কুমার দাস। তিনি শুধু একজন কবি নন-তিনি একজন সেতুবন্ধনকারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বাংলা সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার লেখালেখি, গবেষণা, এবং সংগঠক হিসেবে ভূমিকা-সব মিলিয়ে তিনি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।

বাংলাদেশে জন্ম, পরে কানাডায় অভিবাসন-এই দুই ভৌগোলিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তিনি যে সাহিত্যচর্চা গড়ে তুলেছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা। কানাডায় বসে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা, লেখকদের একত্রিত করা, অনুবাদের মাধ্যমে দুই ভাষার মধ্যে সেতু তৈরি করা-এসবই তার দীর্ঘদিনের কাজ। এই প্রকল্পে তার অংশগ্রহণ যেন স্বাভাবিক পরিণতি-যেখানে তিনি শুধু সহযোগী নন, তিনি এক সহ-নির্মাতা।

আমি যখন তাকে সেই সন্ধ্যায় দরজায় দাড়িয়ে হাসিমুখে স্বাগত জানাতে দেখলাম, তখন বুঝেছিলাম-এই আয়োজন তার জন্য কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি তার বহুদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ।

কিছুক্ষণ পরই যেন ঘরের আলো বদলে গেল। প্রবেশ করলেন জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক—এক উষ্ণ, উজ্জ্বল হাসি নিয়ে। তার উপস্থিতি শুধু একজন কবির নয়, একজন দৃষ্টিভঙ্গির। তিনি যেন সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এক অদ্ভুত শক্তি-যা মুহূর্তেই পুরো পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলল। তার পাশে সুব্রত কুমার দাস- দু’জনের এই যুগলবন্দি যেন এই সন্ধ্যার মূল সুর।

অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমেই জর্জের উচ্ছ্বসিত বক্তৃতা-একটি ভাষা, যা শুধু কথা নয়, অনুভব। তারপর সুব্রতর শান্ত, স্থির, গভীর উচ্চারণ-যেখানে প্রতিটি শব্দ যেন ভাবনার ভিত গড়ে তোলে।

এই আয়োজনের পেছনের গল্পটাও কম বিস্ময়কর নয়। পাঁচজন কানাডীয় কবির ইংরেজি কবিতাকে সুরে বাঁধা এবং সেই সঙ্গে তাদের বাংলা অনুবাদকে গান হিসেবে উপস্থাপন-এ যেন সাহিত্য ও সংগীতের এক অনন্য মিলন। বহু বছর ধরে জর্জ এই প্রকল্প চালিয়ে আসছেন, কিন্তু এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা এতে যুক্ত হলো। আর এই সংযোজনের পেছনে রয়েছে এক দশকের বিশ্বাস, সম্পর্ক, এবং সাংস্কৃতিক আকর্ষণ।

কানাডার বহুসাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলা ভাষার এই অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি ভাষার জয় নয়-এটি একটি পরিচয়ের স্বীকৃতি।

অনুষ্ঠানের মূল পর্বে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল-এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি এক ধরনের সৃজনশীল বিপ্লব। পাঁচজন কবি-আয়েষা চ্যাটার্জী, জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, সুব্রত কুমার দাস, লুইস বার্নিস হাফ এবং জিয়োভানা রিচিও—তাদের কবিতা যেন এই সন্ধ্যায় নতুন জীবন পেল। শব্দ আর সুরের মিলনে তারা এক নতুন রূপ ধারণ করল, যেখানে কবিতা আর গান-দুই ভিন্ন জগত-একটি অভিন্ন অনুভূতিতে এসে মিশল।

সাধারণভাবে একটি কবিতার দুইটি জীবন। প্রথমটি তার মূল ভাষায়, আর দ্বিতীয়টি তার সুরারোপে। সেভাবে করা হয়েছে পাঁচ কবির পাঁচটি ইংরেজি কবিতা। কিন্তু এই প্রকল্পের বিশেষত্ব এই যে, এখানে প্রথমে এসেছে কবিতার বাঙলায়ন। তারপর সেই অনুবাদে দেওয়া হয়েছে সুর। একের পর এক কবিকে মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবি প্রথমে তার পছন্দের ভিন্ন একটি কবিতা পাঠ করেছেন। এরপর তিনি উচ্চারণ করেছেন সেই ইংরেজি কবিতাটি যেটি গানে রূপ দেওয়া হয়েছে। তার পাঠের পর সেটি গেয়েছেন শিল্পী। এরপর কবি তৃতীয় কবিতাটি উচ্চারণ করেছেন। সেটির বাংলা অনুবাদ পাঠ করা হয়েছে। এরপর শিল্পী সেই বাংলা অনুবাদ কবিতাটির গান পরিবেশন করেছেন। যেন একই নদী-কখনো ইংরেজি স্রোতে, কখনো বাংলার ঢেউয়ে।

অনুষ্ঠানের সুরারোপের দায়িত্বে ছিলেন পল্লবী মজুমদার-সাস্কাটুনে বসবাসকারী এক অসাধারণ বাঙালি এই সুরকার। নয়টি কবিতায় তার সুর, আর একটি কবিতায় সুর দিয়েছেন গাগেনহেম পুরস্কারপ্রাপ্ত জেমস রলফ। তাঁদের সুরে কবিতাগুলো শুধু উচ্চারিত হয়নি—তারা অনুভূত হয়েছে, দেহ পেয়েছে, স্পন্দন পেয়েছে।

যখন মঞ্চে এলেন শিল্পী শমিত বড়ুয়া, তার কণ্ঠে বাংলা অনুবাদগুলো যেন এক নতুন মাত্রা পেল। তার গায়কি ছিল স্থির, সংযত, অথচ গভীর-যেন প্রতিটি শব্দ তিনি বুকে ধারণ করে আমাদের সামনে তুলে ধরছেন। আর তারপর-ছোট্ট শ্রেয়া বড়ুয়া। শ্রেয়া ইংরেজি গানগুলো পরিবেশন করেছেন। 

মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে যখন শ্রেয়া দাঁড়াল, পুরো হল যেন এক মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেল। তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্বচ্ছতা, এক নির্ভীক সৌন্দর্য। এত অল্প বয়সে এমন পরিপক্বতা—শ্রোতারা যেন মুগ্ধ হয়ে গেল। আমি নিজেও কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম-আমি কোথায় আছি। শুধু শুনছিলাম।

পিয়ানোতে সঙ্গত করছিলেন টমসন হন—তার আঙুলের স্পর্শে প্রতিটি সুর যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। কখনো কোমল, কখনো তীব্র-তার সঙ্গত পুরো পরিবেশনাকে একটি পূর্ণতা দিয়েছে।

এই সন্ধ্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন অনুবাদকরা। তাসমিনা খান, সুব্রত কুমার দাস নিজে, এবং ফারজানা নাজ শম্পা—তাঁদের অনুবাদ ছাড়া এই সেতুবন্ধন সম্ভব হতো না। একটি ভাষার অনুভূতিকে আরেকটি ভাষায় একই শক্তিতে তুলে ধরা—এটি সহজ কাজ নয়। কিন্তু তারা তা করেছেন নিপুণভাবে, সংবেদনশীলতার সঙ্গে।

এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম-কীভাবে একটি কবিতা শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সুরের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে, মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, নতুন করে জন্ম নেয়। আর তখনই মনে হলো—এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসের একটি মুহূর্ত।

এই পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক। তার কণ্ঠ, তার উপস্থাপনা, তার উপস্থিতি- সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত শক্তি। তিনি শুধু অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি, তিনি যেন প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তুলছিলেন। তার প্রতিটি শব্দে ছিল উত্তেজনা, প্রতিটি বিরতিতে ছিল গভীরতা। তিনি প্রমাণ করলেন-একজন কবি শুধু লেখেন না, তিনি একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করেন।

আর তার পাশে সুব্রত কুমার দাস-যিনি এই আয়োজনের সহ-পরিকল্পনাকারী হিসেবে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার উপস্থিতি ছিল মাটির মতো-নির্ভরযোগ্য, স্থির, অথচ গভীর। তিনি যেন আমাদের সবাইকে একত্রিত করলেন-একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি, একটি অনুভূতির ভেতর।

এবার, প্রথমবারের মতো বাংলা যুক্ত হলো। এটি শুধু একটি ভাষার সংযোজন নয়-এটি একটি স্বীকৃতি, একটি সম্মান। আমি একজন বাঙালি হিসেবে সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুত গর্ব অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিল-আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের অনুভূতি-সবকিছু আজ একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, এটি একটি সামষ্টিক আনন্দ।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে এসে আমি বুঝতে পারছিলাম-এই সন্ধ্যা শুধু দেখা বা শোনা নয়, এটি আমার ভেতরে কোথাও স্থায়ী হয়ে গেছে। যেন এক নীরব ঢেউ, যা ধীরে ধীরে ভেতরের স্তরগুলোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন আমরা ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছিলাম, তখনও চারপাশে সেই সুর, সেই শব্দ, সেই অনুভূতি ভাসছিল। তানভীর চুপচাপ হাঁটছিল, আর আমি-আমি তখনও কথা বলে যাচ্ছিলাম, যেন এই অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে চাইছি, শব্দে বেঁধে ফেলতে চাইছি।

শেষবারের মতো পেছনে তাকালাম। আলো জ্বলছে, মানুষজন এখনও কথা বলছে, কেউ হাসছে, কেউ ভাবছে। মনে হলো-এই সন্ধ্যা শেষ হয়নি, এটি শুধু ছড়িয়ে পড়েছে।

টরন্টোর পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে স্কারবরো এবং ইস্ট ইয়র্ক এলাকায়, বিপুলসংখ্যক বাঙালি বাস করেন। তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতি, তাদের সাহিত্য—সবকিছুই এই শহরের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়কে মূলধারার এমন একটি মঞ্চে তুলে ধরা-এটি সহজ বিষয় নয়। এই আয়োজন সেই কাজটিই করেছে। আর তখনই মনে হয়-এই সন্ধ্যা শুধুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। এটি ছিল একটি ঘোষণা-যে আমরা আছি, আমরা সৃষ্টি করি, আমরা যুক্ত হই, এবং আমরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক তার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, সুব্রত কুমার দাস তার সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়ে, এবং কানাডিয়ান মিউজিক সেন্টার তার ঐতিহাসিক পরিসর দিয়ে-একসাথে মিলে যে মুহূর্তটি তৈরি করলেন, সেটি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত এসে মনে হয়—
কিছু আয়োজন থাকে, যা শেষ হয়ে যায়।
আর কিছু আয়োজন থাকে, যা শেষ হওয়ার পরও আমাদের ভেতরে চলতে থাকে।
এই সন্ধ্যা—ঠিক তেমনই একটি।

 

কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ বাংলাদেশি নিহত
কাদের আহমদ, জসিম উদ্দিন, জিবাল উদ্দিন, মস্তাক আহমদ ও জুবায়ের আহমদ

কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়।

রবিবার (২১ জুন) সকালে কাতারের শাহানিয়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।

নিহত প্রবাসীরা হলেন- গাছবাড়ি এলাকার কাদের আহমদ, আগতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন, আমরপুর গ্রামের জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের মস্তাক আহমদ এবং একই গ্রামের জুবায়ের আহমদ।

এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই প্রবাসীরা পিকআপভ্যানে করে তাদের কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন। পথে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারালে ঘটনাস্থলেই পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশিসহ ছয়জন নিহত হন।

এক শোকবার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা আমাদের এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

তিনি নিশ্চিত করেন যে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নিহত ৫ বাংলাদেশির মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে কাতার দূতাবাসের শ্রম উইংকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে সরকার নিহতের পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অমিয়/

প্রকৃতির বিস্ময়ে আলোকিত এক দেশ ফিনল্যান্ডে বছরের দীর্ঘতম দিন, মধ্যরাতেও হাসে সূর্য

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
ফিনল্যান্ডে বছরের দীর্ঘতম দিন, মধ্যরাতেও হাসে সূর্য
ছবি: হেলসিঙ্কির কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য

পৃথিবীর অনেক দেশেই গ্রীষ্ম আসে, সূর্য উজ্জ্বল হয়, দিন বড় হয়। কিন্তু ফিনল্যান্ডে গ্রীষ্মের এক বিশেষ মুহূর্ত আছে, যা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। জুনের শেষভাগে এসে এই উত্তর ইউরোপের দেশটি উপভোগ করে বছরের দীর্ঘতম দিন ও ক্ষুদ্রতম রাত। এ সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে এমনকি সূর্য একেবারেই অস্ত যায় না। রাত ১২টায়ও আকাশে দিনের আলো বিরাজ করে।

২০২৬ সালে ফিনল্যান্ডে জুহান্নুস বা মিডসামার ডে পালিত হচ্ছে ২০ জুন। এর ঠিক পরদিন, ২১ জুন, ঘটে গ্রীষ্মকালীন অয়ন বা Summer Solstice, যা উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মুহূর্ত হিসেবে পরিচিত।

যখন রাত হারিয়ে যায়

ফিনল্যান্ডের রাজধানী Helsinki-তে জুন মাসে সূর্যাস্ত হয় প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি এবং ভোরের আগেই আবার সূর্য উঠে যায়। ফলে প্রকৃত অন্ধকার বলতে কিছুই থাকে না। আকাশে সারারাত নীলাভ-সোনালি আলো ছড়িয়ে থাকে, যাকে ফিনিশরা বলে "White Night" বা সাদা রাত।

আর দেশের উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চল Lapland-এ পরিস্থিতি আরও বিস্ময়কর। সেখানে টানা কয়েক সপ্তাহ সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। মধ্যরাতেও সূর্যের আলোয় পাহাড়, বনভূমি ও হ্রদ ঝলমল করে।

কেন হয় এই ঘটনা

পৃথিবী তার অক্ষের উপর প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। জুন মাসে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে সূর্যের আলো দীর্ঘ সময় ধরে উত্তরাঞ্চলে পড়ে এবং দিন সবচেয়ে বড় হয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় Summer Solstice বা গ্রীষ্মকালীন অয়ন।

এই দিন থেকেই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রীষ্মের সূচনা ধরা হয়। যদিও এর পরের দিনগুলোতে দিন ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করে, তবুও গ্রীষ্মের আবহ থাকে আরও কয়েক মাস।

পুরো দেশ যেন উৎসবের দেশে পরিণত হয়

ফিনল্যান্ডে বছরের দীর্ঘতম দিন কেবল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি জাতীয় অনুভূতিরও অংশ। জুহান্নুস বা মিডসামার উৎসবকে কেন্দ্র করে শহর থেকে লাখো মানুষ ছুটে যায় গ্রামাঞ্চল, দ্বীপপুঞ্জ ও গ্রীষ্মকালীন কটেজে। পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়দের নিয়ে তারা প্রকৃতির মাঝে উদযাপন করে এই আলোর উৎসব।

হ্রদের তীরে জ্বলে ওঠে বিশাল অগ্নিকুণ্ড বা ‘কোক্কো’, গরম হয় সাউনা, শুরু হয় গান, নাচ, বারবিকিউ ও নৌবিহার। অনেকেই মধ্যরাতে হ্রদে সাঁতার কাটেন, কারণ তখনও চারপাশে দিনের আলো থাকে।

পর্যটকদের জন্য এক স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা

বিশ্বের নানা দেশ থেকে পর্যটকরা এই সময় ফিনল্যান্ডে আসেন শুধুমাত্র ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্য দেখার জন্য। বিশেষ করে ল্যাপল্যান্ডে রাত ১২টায় সূর্যকে আকাশে দেখা অনেকের কাছে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

প্রকৃতি প্রেমী, আলোকচিত্রী এবং ভ্রমণকারীদের জন্য এটি এক অনন্য সময়। রাতের আকাশে সূর্যের সোনালি আলো, শান্ত হ্রদের পানিতে তার প্রতিফলন এবং নিস্তব্ধ বনভূমির সৌন্দর্য মিলে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব পরিবেশ।

বাংলাদেশের জন্য বিস্ময়ের গল্প

বাংলাদেশে যেখানে জুন মাস মানেই বর্ষার মেঘ, বৃষ্টি আর স্বাভাবিক দিন-রাতের পালাবদল, সেখানে ফিনল্যান্ডের দীর্ঘতম দিন যেন প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপকথা। এখানে রাত নামলেও অন্ধকার নামে না। শিশুরা গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে খেলতে পারে, মানুষ মধ্যরাতেও হাঁটতে বের হয়, আর প্রকৃতি যেন ২৪ ঘণ্টাই জেগে থাকে।

ফিনল্যান্ডের মানুষের কাছে এই সময়টি শুধু ঋতু পরিবর্তনের নয়, বরং জীবনকে উদযাপনের সময়। দীর্ঘ ও অন্ধকার শীতের পর সূর্যের এই অফুরন্ত উপস্থিতি তাদের মনে নিয়ে আসে নতুন উদ্দীপনা, আনন্দ ও আশার বার্তা।

শেষ কথা

বিশ্বের সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত ফিনল্যান্ডের সুখের পেছনে প্রকৃতিরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বছরের দীর্ঘতম দিন সেই প্রকৃতিরই এক অসাধারণ উপহার। যখন মধ্যরাতে সূর্য হাসে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন মানুষের জন্য বিশেষ এক উৎসবের আয়োজন করেছে।

ফিনল্যান্ডের এই দীর্ঘতম দিন শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, এটি আলো, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধের এক অনন্য মিলনমেলা।

তামান্না রুপা/

মানামায় বাংলাদেশ দূতাবাসে গণশুনানি অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ১০:২৩ এএম
মানামায় বাংলাদেশ দূতাবাসে গণশুনানি অনুষ্ঠিত
ছবি: খবরের কাগজ

বাহরাইনের মানামায় বাংলাদেশ দূতাবাসে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সরোয়ারের সভাপতিত্বে বাংলাদেশে দূতাবাসের হলরুমে এ গণশুনানি হয়। 

এ অনুষ্ঠানে সাধারণ প্রবাসীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতাসহ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রদূত মো. রইস হাসান সরোয়ার তার বক্তব্যে গণশুনানিতে উপস্থিত সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গণশুনানির মাধ্যমে দূতাবাস সরাসরি প্রবাসী কর্মীদের সমস্যা সর্ম্পকে অবহিত হতে পারবে। দূতাবাসের কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে প্রবাসীদের গঠনমূলক পরামর্শ দূতাবাসের সেবার মানকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এছাড়া, তিনি কোনো সমস্যা হলে সরাসরি দূতাবাসের অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

রাষ্ট্রদূত সকলকে বাহরাইনের আইন-কানুন মেনে চলা এবং বৈধভাবে এই দেশে অবস্থান করার অনুরোধ জানান।

বিদেশের মাটিতে কারও দ্বারা যেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সবাইকে অনুরোধ জানান।

এ গণশুনানিতে যোগদানের জন্য দূতাবাসের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রবাসীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাহরাইনে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত শতাধিক প্রবাসী এই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রবাসীরা দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের কাছে সরাসরি তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। 

এ সময় দূতাবাসের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রশ্নের তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। প্রবাসীরা তাদের প্রস্তাবনা, মতামত, অভিযোগ, পরামর্শ সরাসরি ই-মেইলে ([email protected]) পাঠাতে পারবেন।

অন্তরা/

জেনেভায় আইএলও এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সভাপতিত্ব করলেন শ্রমমন্ত্রী

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
জেনেভায় আইএলও এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সভাপতিত্ব করলেন শ্রমমন্ত্রী
ছবি: বাংলাদেশ মিশন, জেনেভা

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আরব, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৭টি সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাদেশের শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

মঙ্গলবার (৯ জুন) জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলন চলাকালীন জাতিসংঘের দপ্তরে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান।

এ বৈঠকে আরব, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ১৫ জন মন্ত্রীসহ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।

বৈঠকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মহাপরিচালক এবং আরব ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকরা বক্তব্য দেন।

শ্রমমন্ত্রী তার বক্তব্যে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সমন্বয়কারী হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব পালনের সময় সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আইএলওর অন্যতম বৈচিত্র্যময় গ্রুপ হিসেবে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ বিভিন্ন উন্নয়ন স্তর, অর্থনৈতিক কাঠামো, সংস্কৃতি ও শ্রমবাজার বাস্তবতার দেশগুলোকে একত্রিত করেছে। এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সামাজিক ন্যায়বিচার, শোভন কাজ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপেকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।

তিনি বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বৈশ্বিক শ্রম শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক করার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান আইএলওর মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের বিশেষ অবস্থান তুলে ধরে বলেন, প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য ও সমসাময়িক উন্নয়ন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই গ্রুপের বৈচিত্র্য শ্রম, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি রাখে।

তিনি উল্লেখ করেন, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের বৈচিত্র্যই এর অন্যতম শক্তি এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে “Connecting Diversity, Advancing Unity” প্রতিপাদ্যের আলোকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

শ্রম সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সমন্বয়কারী হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্বপালনের সময় সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কর্মজগত আজকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোভন কাজের প্রসারে সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের ভূমিকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তির প্রতিনিধিত্বকারী এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপে আইএলওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক গ্রুপ। গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপটির আঞ্চলিক সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করার ধারাবাহিকতায় এ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করল।

আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে অভিন্ন অগ্রাধিকারসমূহ এগিয়ে নিতে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

থিও/অমিয়/

ইতিহাস, সৌন্দর্য আর প্রশান্তির পরভো শহরে এক দিন

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম
আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
ইতিহাস, সৌন্দর্য আর প্রশান্তির পরভো শহরে এক দিন
ছবি: খবরের কাগজ

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পরভো (Porvoo) শহর। এই শহরে এসে মনে হলো যেন কয়েক শতাব্দী পেছনে চলে গেছি।

আধুনিক ফিনল্যান্ডের ব্যস্ত নগরজীবনের বাইরে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল এই শহর। দেশটির দ্বিতীয় প্রাচীনতম শহর হিসেবে পরিচিত পরভো শুধু ফিনল্যান্ডেরই নয়, পুরো নর্ডিক অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য।

সম্প্রতি শহরটি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। শহরে প্রবেশের পরই চোখে পড়ে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত লাল রঙের কাঠের গুদামঘরগুলো। কয়েকশ বছর আগে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত এসব ভবন আজ পোরভোর পরিচয় বহন করছে। পর্যটকদের ক্যামেরায় সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে এই দৃশ্য।

পনরভোর পুরনো শহর বা ‘ওল্ড টাউন’-এ হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো যেন কোনো রূপকথার শহরে প্রবেশ করেছি। সরু পাথরের রাস্তা, শত শত বছরের পুরনো কাঠের বাড়ি, ছোট ছোট ক্যাফে, শিল্পকর্মের দোকান এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য পুরো এলাকাকে অন্যরকম সৌন্দর্য দিয়েছে। শহরের প্রতিটি গলি যেন ইতিহাসের এক একটি অধ্যায়।

শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পরভো ক্যাথেড্রাল। ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত এই গির্জাটি ফিনল্যান্ডের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো শহর এবং নদীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এখানে আসা পর্যটকদের অনেকেই কিছু সময় নীরবে বসে শহরের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করেন।

পরভো নদীর তীরও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। গ্রীষ্মকালে নদীর পাশে হাঁটা, নৌভ্রমণ কিংবা খোলা আকাশের নিচে বসে কফি পান করার আনন্দই আলাদা। নদীর দুই পাড়ে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকে পুরো এলাকা।

শহরটি শুধু ইতিহাসের জন্য নয়, শিল্প ও সংস্কৃতির জন্যও সুপরিচিত। বিখ্যাত ফিনিশ কবি জোহান লুডভিগ রুনেবার্গের স্মৃতি বহন করছে এই শহর। তার বাড়ি বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আর্ট গ্যালারি ও হস্তশিল্পের দোকানে স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

পরভোর আরেকটি আকর্ষণ হলো এর ক্যাফে সংস্কৃতি। শহরের ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে স্থানীয় কফি, পেস্ট্রি ও ঐতিহ্যবাহী ফিনিশ খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পুরনো শহরের পরিবেশে বসে এক কাপ গরম কফি যেন ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশির মতো আমিও বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে পরভোকে আলাদা করে মনে রাখার কারণ হলো এর প্রশান্ত পরিবেশ, ঐতিহাসিক আবহ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিখুঁত সমন্বয়। যারা ভ্রমণ ভালোবাসেন, বিশেষ করে ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী, তাদের জন্য পরভো অবশ্যই একটি দর্শনীয় স্থান।

হেলসিঙ্কি থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের যাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় এই শহরে। তাই ফিনল্যান্ডে আসা কোনো পর্যটকের ভ্রমণ তালিকায় পরভো থাকা উচিত। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো ইউরোপের সৌন্দর্য অনুভব করতে চাইলে পরভো হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।

পরভো শুধু একটি শহর নয়, এটি ফিনল্যান্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

জামান সরকার/আমান