প্রকৃতি অনেক সময় মানুষকে অবাক করে দেয় তার অদ্ভুত খেয়ালে। এমনই এক অবাক করা বিষয়ে আজ আপনাদের জানাব। ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূলে আছে এমন এক রাস্তা, যা দিনে দুবার সমুদ্রের পানির নিচে তলিয়ে যায় আবার ফিরে আসে। এই রাস্তার নাম প্যাসেজ দ্যু গোয়া (Passage du Gois)। বিউভোয়া-সুর-মের (Beauvoir-sur-Mer) থেকে নোয়ারমোতিয়ে দ্বীপ (Île de Noirmoutier) পর্যন্ত বিস্তৃত এই অনন্য পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার।
দিনে দুবার ভাটা পড়লে গাড়ি ও মানুষ চলাচল করতে পারে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সমুদ্রের পানি ধেয়ে এসে প্রায় ১৩ ফুট গভীর পানির নিচে ঢেকে ফেলে পুরো পথটিকে। ভাটার সময় মাছ ধরতে আসা মানুষ আর হাঁটতে বেরোনো ভ্রমণপিয়াসীরা এখানে জমায়েত হন, উপভোগ করেন দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি আর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সাগরের জন্ম দেওয়া এক বিস্ময়
প্যাসেজ দ্যু গোয়ার জন্ম এক বিরল প্রাকৃতিক ঘটনার ফলে। দুটি বিপরীত সামুদ্রিক স্রোতের সংঘাতে ধীরে ধীরে সাগরের তলদেশ উঁচু হতে থাকে, আর গড়ে ওঠে এই সাবমার্সিবল রাস্তা। প্রতিদিন ভাটা নামলে সেই অপূর্ব দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। যেন প্রকৃতি নিজেই সময় মেপে তৈরি করেছে এক চলমান রাস্তা, যা ক্ষণিক পরেই আবার লুকিয়ে যাবে গভীর পানির নিচে।
ইতিহাস ও পরিচিতি
এই রাস্তা দিয়ে প্রথম পারাপার শুরু হয় ৮৪৩ সালে। তখন কিছু বন্দি নোয়ারমোতিয়ে দ্বীপ থেকে পালিয়ে ভাটার সময় হেঁটে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে যায়। ১৮০০ শতকে ‘গোয়া’ শব্দটি প্রচলিত হয়, যার আঞ্চলিক অর্থ ‘পানি মাড়িয়ে হাঁটা।’ সেই সময়ে এটি মূলত হাঁটা বা গবাদি পশুর চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো।
.jpg)
পরবর্তী সময়ে রাস্তাটিকে সুসংগঠিত করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৭৮০ সালে প্রথম কাঠের খুঁটি বসানো হয় রাস্তার চিহ্ন দিতে। ১৮৪০ সালের দিকে ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলাচল শুরু হয়। এরপর ১৮৬৮ সালে রাস্তা পাথর দিয়ে বাঁধানো হয়, ১৯২৪ সালে আবারও মেরামত করা হয়। অবশেষে ১৯৩০-এর দশকে রাস্তা পাকা করা হয় এবং আশ্রয়কেন্দ্র (refuge marker) তৈরি করা হয়, যাতে হঠাৎ জোয়ারে আটকে পড়লে মানুষ সেখানে নিরাপদে থাকতে পারে। ১৯৪২ সালের ১১ জুলাই থেকে প্যাসেজ দ্যু গোয়া ও এর আনুষঙ্গিক স্থাপনাগুলো ফ্রান্সের ঐতিহাসিক নিদর্শনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
খেলাধুলার মহোৎসব ‘স্ট্রাইডস অব গোয়া’
প্যাসেজ দ্যু গোয়া শুধু ইতিহাস আর প্রকৃতির বিস্ময় নয়, এটি খেলাধুলার এক ব্যতিক্রমী মঞ্চও। ১৯৮৭ সাল থেকে এখানে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ‘স্ট্রাইডস অব গোয়া’, যা ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও বন্ধুত্বের এক উৎসব। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের শেষে হয় সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা ‘সমুদ্রের সঙ্গে দৌড়’। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের ক্রীড়াবিদরা অংশ নেন। চার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ রাস্তা দৌড়ে পার হতে হয় তাদের। অনেক প্রতিযোগী হাঁটু পর্যন্ত পানিতে ডুবে অন্য প্রান্তে পৌঁছান। গতি আর সহনশক্তির অনন্য মিশ্রণ ছাড়া এখানে জয়লাভ সম্ভব নয়। দর্শনার্থীদের জন্য এটি এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক লড়াই।
আজকের দিনে Passage du Gois শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ। সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের লড়াই আর অভিযোজনের গল্প বহন করে এটি। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সেখানে ভিড় জমান, শুধু এই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা দেখার জন্য। বিশেষ করে ভাটার সময় যখন গাড়ি, সাইকেল কিংবা পথচারীরা সমুদ্রের বুক চিরে হেঁটে চলে, তখন দৃশ্যটি সত্যিই রূপকথার মতো মনে হয়।
তারেক/
.jpg)
.jpg)