চট্টগ্রামের আনোয়ারার জুঁইদণ্ডী ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা একটি ছোট্ট ফুলের সুবাস এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর, যখন চারদিকে অন্ধকার আর হতাশার ঘনঘটা, ঠিক তখনই জিএম মামুনুর রশিদের হাত ধরে জন্ম নেয় ‘জুঁইফুল’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটি স্বপ্ন দেখে এক সবুজ পৃথিবীর, যা বিশ্বাস করে মানবিকতার শক্তিতে আর কাজ করে নীরবে কিন্তু নিরলসভাবে।
জুঁইফুল শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, এটি একটি আন্দোলন। সেবা আর সবুজের এক অনন্য সংমিশ্রণ। যেখানে পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তা সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে।
সবুজের ডাকে প্রকৃতির সঙ্গে সংলাপ
‘একটা পৃথিবী নষ্ট হয়ে গেছে, আরেকটি পৃথিবী চাই’ কবির এই আকুতিই যেন জুঁই ফুলের মূলমন্ত্র। ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই, যখন বৃক্ষ রোপণ অভিযান কর্মসূচি-২৩-এ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাঝে চারাগাছ বিতরণ করা হয়, তখন বোঝা গেল এই সংগঠন স্বপ্ন দেখে বড়। ১ লাখ চারাগাছ রোপণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে তারা। প্রকৃতি প্রকল্পের চারটি স্তম্ভ- বনজ গ্রাম, ঔষধি গ্রাম, ফলদ গ্রাম এবং কৃষকের মাঠ স্কুল। এগুলো শুধু প্রকল্পের নাম নয়, এগুলো জীবনঘনিষ্ঠ উদ্যোগ। বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ রোপণ, নদীভাঙন রোধে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ, স্কুল-মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে চারা বিতরণ- প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে গভীর চিন্তা আর দূরদর্শিতা।
মানুষের পাশে, দুর্দিনে-সুদিনে
করোনার সেই ভয়াবহ সময়, যখন মানুষ ঘরবন্দি, যখন হতদরিদ্র পরিবারগুলো না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, তখন জুঁইফুল হাজির হয়েছে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভয়াবহ বন্যায়ও বানভাসি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জুঁইফুল টিম। এ ছাড়া মাহে রমজানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইফতার বিতরণসহ পথশিশুদের মাঝে খাবার পৌঁছে দেওয়া- প্রতিটি কাজেই ফুটে উঠেছে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সত্যিকার অর্থে জুঁইফুল কেবল খাবার বিতরণ করছে না, বিতরণ করছে ভালোবাসা, ছড়িয়ে দিচ্ছে মানবিকতার বীজ।
জ্ঞানের আলো ছড়ায়
‘জুঁইফুল বইঘর’ যেখানে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি পরতে পরতে। ‘কৃষ্ণচূড়া ব্লাড ব্যাংক’ যেখানে রক্তের বন্ধনে বাঁচে অসংখ্য প্রাণ। করজে হাসানাহ যেখানে সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে দাঁড়িয়ে যায় ভেঙে পড়া মানুষ। ‘জুঁইফুল মেধাবৃত্তি’ যেখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা পায় এগিয়ে যাওয়ার সাহস। দ্বিচক্রযান প্রকল্প, সালসাবিল সাংস্কৃতিক সংসদ, পাঠচক্র ও ছাত্রাবাস, জুঁইফুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন প্রতিটি উদ্যোগ একেকটি সামাজিক বিপ্লবের ঘোষণা।
সুস্থ বিনোদন
আজকের তরুণ প্রজন্মকে অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে জুঁইফুল আয়োজন করে চড়ুইভাতি, গেট টুগেদার, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ, গান, খেলাধুলা- সবকিছুতেই থাকে পরিশীলিত বিনোদনের ছোঁয়া। কারণ জুঁইফুল জানে, সুস্থ মনই পারে সুন্দর সমাজ গড়তে।
ফুলের মতো ছড়ায় সুবাস
জুঁইফুল নামটাই যেন একটা কবিতা। ছোট্ট এই ফুলের সুবাস যেমন দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি এই সংগঠনের কাজও ছড়িয়ে পড়ুক দেশের প্রতিটি প্রান্তে। নষ্ট পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলার এই স্বপ্নযাত্রায় জুঁইফুল হয়ে উঠুক আমাদের সবার অনুপ্রেরণা। কারণ, পরিবর্তন আসে ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকে। একটি গাছ, একটি হাসি, একটি সাহায্যের হাত এভাবেই বদলে যায় পুরো পৃথিবী। আর সেই পরিবর্তনের অগ্রদূত হয়ে এগিয়ে চলেছে জুঁইফুল সেবা ও সবুজের এক অনন্য সংগঠন।
জুঁইফুল আজ আর শুধু আনোয়ারার জুঁইদণ্ডীতে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে তাদের কর্মী। সবাই মিলে তৈরি করছে এক বিশাল পরিবার।
তারেক/
.jpg)
.jpg)