প্রতারণার বৈচিত্র্যময় কিছু ঘটনা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। খুবই ছোটবেলার ঘটনা। আমাদের বাড়ির পাশে একজন ভাড়াটে এসেছেন। তিনি আবার পুরান ঢাকার ভাষায় কথা বলে থাকেন। আমরা কৌতূহল নিয়ে তার কথা শুনি। তিনি এসেই পাড়া-প্রতিবেশী সবার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললেন। তার এ ভাব জমানোটা তখন আমার কাছে একটা আর্ট মনে হতো। একটা মানুষ কীভাবে আশপাশের মানুষের সঙ্গে এতটা আন্তরিকতা দেখাতে পারেন তা আমার মাথায় আসত না।
পাড়ার গণ্যমান্য যারা আছেন তিনি তাদের মামা বলে ডাকেন। একসঙ্গে চা-সিগারেট খান। আড্ডা দেন। এজমালী পুকুরে তাদের সঙ্গে গিয়ে মাছ ধরেন। সে মাছ আবার সমান সমান ভাগ করে নিয়ে আসেন। আমার পাশে থাকেন বলে আমি তার এ কীর্তি দেখে অবাক হই। তার মাছের খাড়ইয়ের ভেতর কৈ, শিং মাছ দেখে মুগ্ধ হই। কত সহজেই এ ঢাকাইয়া গ্রামের মাতব্বর শ্রেণির লোকের সঙ্গে দহরম ভাব গড়ে তুলে তাদের এজমালী পুকুরের মাছ ধরে সমান ভাগ বসান। তবে মাঝে মাঝে এ ভদ্রলোক হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যান দেখি।
তার সঙ্গী-সাথীরা বাড়িতে এসে তার স্ত্রীর কাছে তার কথা জানতে চান। তিনি নাকি চিংড়ি মাছের ব্যবসা করে থাকেন। তাই লঞ্চে চড়ে চাঁদপুর, বরিশাল আর মাদারীপুর যান। ফেরেন কয়েক দিন পরপর। এভাবেই তার জীবন চলছিল। ব্যবসা শেষ হলে আবার এসে পাড়ার মানুষদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেন। এলাকার প্রতিটি অভিজাত শ্রেণি মানুষের পরিবারের সঙ্গে তার একটা অন্তরঙ্গ ভাব জমে উঠল। তাদের বাড়িতে এটা-সেটা গিফট পাঠান। তারা আবার তাদের বাড়িতে ভালো-মন্দ পিঠাপুলি তৈরি করলে ঢাকাইয়ার বাসায় দিয়ে যান। তার স্ত্রীও এলাকার মানুষদের পরিবারের সঙ্গে একেবারে মিশে গেলেন। তখনই আমার কাছে একটা খটকা লাগল। ঘটনা কী? এত দহরম-মহরম কীসের? এগুলো চোখের সামনে দেখছি আর অবাক হচ্ছি। এলাকার মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আমার কাছে অ্যাবনরমাল লাগল।
হঠাৎ করেই একটা ঘটনা শুনে খুবই হোঁচট খেলাম। পাশের এলাকার একজন ব্যবসায়ী ঢাকাইয়ার খোঁজ করছেন। তিনি তার শ্বশুরবাড়ি গেছেন জানতে পেরে তিনি চলে গেলেন। না, সে ভদ্রলোক ঢাকাইয়ার খোঁজে কয়েক দিন পর আবার এলেন। তাকে না পেয়ে তিনি চলে গেলেন। তার পর এখন একদিন পরপর আসতে লাগলেন ভদ্রলোকটি। আমরা তাকে ঘন ঘন ঢাকাইয়ার খোঁজ করতে দেখে একটা সন্দেহ পোষণ করলাম। তাকে খোঁজার কারণ বোঝার চেষ্টা করলাম। না, তখন কিছুই জানা গেল না। তবে ঢাকাইয়ার কোনো খোঁজই তখন পাওয়া গেল না। ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের সঙ্গে ঢাকইয়ার একটা পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাদের বাড়িতে ঢাকাইয়া বেড়াতে যায় আবার ব্যবসায়ীও ঢাকাইয়ার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। মহা ধুমধামে খাওয়া-দাওয়া চলে তাদের।
কয়েক দিন পর এলাকার মধ্যে হইচই পড়ে গেল। ঢাকাইয়া নিখোঁজ। ব্যবসায়ীর বউয়ের কাছ থেকে ঢাকাইয়ার বউ তার বাবার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে তার গলার হার, হাতের চুড়িসহ ১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। তাই তো এখন প্রতিদিনই ব্যবসায়ী ঢাকাইয়ার খোঁজে তার বাড়িতে আসেন। এদিকে এলাকায় যাদের সঙ্গে তার খুব ভাব হয়েছিল এখন ঢাকাইয়ার খোঁজে তারাও আসতে থাকেন বাড়িতে। কিন্তু কেউ কিছু মুখ খুলে বলছেন না। সবার মাঝেই একটা চাপা ভাব বিরাজ করছে। কিছুদিন যেতে না যেতেই হায় হায় রব পড়ে গেল পুরো এলাকার মধ্যে। যখন দেখছে ঢাকাইয়া আর আসেন না তখনই একে একে বলতে থাকেন আমার ৩ হাজার, ওমুকে বলেন, আমার ৫ হাজার। এভাবেই মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অঙ্ক বের হতে থাকে।
প্রথমেই ঢাকাইয়া যে বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়েছেন তার ও আশপাশের বাচ্চাদের ধরে ধরে তিনি পড়ালেখার ব্যবস্থা করেছেন। ছোটদের তিনি আদর্শলিপি কিনে দিয়ে অক্ষর জ্ঞান শিখানোর চেষ্টা করেছেন। বিকালে আশপাশের ছোট ছেলেমেয়েরা তার কাছে আদর্শলিপি শিখতে আসত। ঢাকাইয়া বিনা বেতনে এমনকি বই কিনে দিয়েও তাদের পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। একটা ভালো মানুষের মুখোশ পরে তিনি সবারই আপন হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সবারই সঙ্গে ভালো খাতির গড়ে তুলেছিলেন ঢাকাইয়া। এভাবেই মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়েছেন এবং কারও কারও কাছ থেকে স্বর্ণালংকার নিয়েছেন। আদতে তিনি ছিলেন একজন পকেটমার। লঞ্চে লঞ্চে তিনি ব্যবসায়ীদের পকেট কাটতেন। সদর ঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে পকেট কেটে তিনি চাঁদপুর নেমে যেতেন অনায়াসে।
একদিন দেখি ঢাকাইয়ার মাথায় চুল নেই। লঞ্চে পকেট কাটার সময় ধরা পড়ার পর মানুষজন তার মাথার চুল কেটে দিয়েছে। প্রচণ্ড মারধরের শিকার হয়েছেন ঢাকাইয়া। বাড়িতে এসে সেবার চুল কেটে ন্যাড়া হয়েছেন। সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন, তিনি অসুস্থ তাই চুল কেটেছেন। এভাবেই আমাদের আশপাশে প্রতারকরা তাদের জাল বিস্তার করে থাকে।
তবে এখনো যে এমন প্রতারণার ঘটনা কমে গেছে সেটা বলা যাবে না। মাঝে মাঝেই এমন প্রতারকদের কথা শোনা যায় নতুন কোনো পদ্ধতি, নতুন কোনো কৌশলে হাতিয়ে নেয় মানুষের টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)