একসময় ইছামতি, ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীতে ডাকাতি হতো ব্যাপক। তখন লঞ্চ এবং ছোট ছোট নৌযান ডাকাতের ভয়ে সব সময় প্রকম্পিত থাকত। যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোতে আনসার সদস্যদের মোতায়েন রাখা হতো। লঞ্চ ছাড়ার সময় প্রতিটি যাত্রী এবং তাদের ব্যাগ তল্লাশি করতেন লঞ্চে থাকা আনসার সদস্যরা। এত নিরাপত্তা নেওয়ার পরও ডাকাতরা ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন। কিছুতেই তাদের রোধ করা তখন সম্ভবপর হতো না।
লঞ্চ যখন বুড়িগঙ্গা নদী ছেড়ে ধলেশ্বরী এবং মেঘনায় পৌঁছাত তখনই আনসার এবং চালকদের হাত-পা বেঁধে লঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নিত ডাকাতদল। তখন ডাকাতদলের প্রথম কাজই ছিল যে একটু হইচই করত তাকেই ছুরি মেরে রক্তাক্ত করে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা। সে রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে কেউ আর হইচই বা প্রতিবাদ করতে সাহস করতেন না। তারপর চলত দীর্ঘক্ষণ ধরে ডাকাতি। যাত্রীদের টাকা আর স্বর্ণালংকার নেওয়াই ছিল ডাকাতদের প্রথম পছন্দ। অন্যান্য ভারী মালামালের দিকে তাদের লোভ ছিল কম। তারা মেঘনা নদীতে ডাকাতি শেষে চাঁদপুরের মোহনা হয়ে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে থাকা ট্রলারযোগে পদ্মা নদী দিয়ে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং পালিয়ে যেতেন। নব্বই দশকের শুরুতে মোবাইল ফোন ছিল না বিধায় কোনো থানাকে অবহিত করাও সহজ ছিল না। তাইতো ডাকাতরা নির্বিঘ্নে ডাকাতি করে পার পেয়ে যেত।
একবার রাত ১০টার সময় ধলেশ্বরী নদীর কাঠপট্টি খেয়াঘাটে একটি ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ৫০ থেকে ৬০ যাত্রী নিয়ে চর মুক্তারপুর থেকে কাঠপট্টি ঘাটের উদ্দেশে ট্রলারটি ছেড়ে আসে। ট্রলারটি মাঝ নদীতে আসতেই সাতজনের একটি ডাকাতদল ট্রলারটির চালকের গলায় বড় ছুরি ধরে তার নিয়ন্ত্রণে নেয়। তখন ট্রলারে থাকা যাত্রীদের টাকা-পয়সা লুট করে একে একে সবাইকে নদীতে ফেলে দেয় ডাকাতদল। কে সাঁতার জানে আর জানে না তা নিয়ে কোনো ভাবনা ছিল না ডাকাতদের। শুধু নারী আর শিশুদের তখন কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন করেনি ডাকাতরা। তাদের ট্রলারে রেখেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দিকে যেতে থাকে ট্রলারটি।
পথিমধ্যে ট্রলারে থাকা একটি বাচ্চা তার ব্যাগ থেকে তার একটি খেলনা পিস্তল বের করে ডাকাতদের দিকে তাক বলে আমার বাবা-মাকে ছেড়ে দে ডাকাত। এ কথা শুনেই ডাকাতদল আর না হেসে পারেনি। বাচ্চার মুখে এমন কথা শুনে ডাকাতদল তার বাবা, মা আর বাচ্চাটিকে একটি চরে নামিয়ে দেয়। এদিকে নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও ট্রলারটিকে ঘাটে না আসতে দেখে ঘাটের থাকা অন্য ট্রলার নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে দেখে মাঝ নদীতে অনেক লোক সাঁতার কাটছে। তখন সে ট্রলারেই ডাকাতদের ফেলে দেওয়া যাত্রীরদের উঠিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ডাকাতি হওয়া ট্রলারটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আরেকবার ইছামতি নদী দিয়ে ট্রলারে করে একটি কোম্পানির মালামাল তালতলা বাজারে বিক্রি করে ফেরার পথে ডাকাতরা তাদের আক্রমণ করে বসে। তাদের মালামাল বিক্রি করার সব টাকা-পয়সা সব লুটে নেয় ডাকাতদল। এমন ঘটনা ঘটে দিনের আলোয় পড়ন্ত বিকেলে। কিন্তু থানার সঙ্গে যোগাযোগের তেমন কোনো সুবিধা না থাকায় ডাকাতদের তখন ধরা যায়নি। ট্রলারে থাকা কোম্পানির বিক্রয় কর্মী এবং তাদের অফিসার ছিল সেদিন। তাই টাকা পয়সা ছিল একটু বেশি পরিমাণে। কোম্পানির মালামাল ট্রলারের টাকা-পয়সা লুট হওয়ায় তখন ডাকাতির ঘটনাটি ব্যাপক হইচই ফেলে দেয়। থানায় মামলা হয়। পুলিশ ডাকাত ধরতে ব্যাপক মাত্রায় অভিযান চালায় তখন।
একসময় ডাকাত ধরা পড়ে। পুলিশ তিনজন ডাকাত ধরে থানায় নিয়ে আসেন। এ অভিযানের নেতৃত্ব দেন তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কুদরত ই খুদা সাহেব। ডাকাত যে টাকা লুট করেছে তার সঙ্গে কোম্পানির খোয়া যাওয়া টাকার সঙ্গে কোনো মিল পাচ্ছে না পুলিশ। কোম্পানির বিক্রয়কর্মীরা সাড়ে ৩ লাখ টাকা ছিল বলে তাদের মামলায় উল্লেখ করেছেন। আর ডাকাতদল বলছে- স্যার, আমরা আড়াই লাখ টাকা এ ট্রলারটি থেকে লুট করেছি। এ নিয়ে ডাকাত আর কোম্পানির বিক্রয় কর্মীদের মধ্যে বাদানুবাদ বেঁধে যায়। তাদের বাদানুবাদে পুলিশ কর্মকর্তারা বিপদে পড়ে যান। একসময় ডাকাতদলের এক সদস্য পুলিশকে উদ্দেশ করে বলেন, স্যার আমরা ডাকাত হতে পারি তয় এ অফিসারদের মতো আমরা চোর না। তারা সাড়ে ৩ লাখ টাকা চুরির কথা বলে ১ লাখ টাকা মেরে দিতে চাচ্ছে। আমরা ডাকাতি করি ঠিক কিন্তু তাদের মতো ছ্যাঁচড়া না। এ কথা শুনে পুলিশ সদস্যরা আরও কনফিউজ হয়ে যায়। তখনই ওসি বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় করা মালামালের কাগজপত্র দেখতে চান। তা পর্যালোচনা করে দেখা যায় ডাকাতরাই সঠিক বলছেন। বিক্রয়কর্মীরা মিথ্যা বলে ১ লাখ টাকা মেরে দিতে চেয়েছিলেন।
তবে আমার দেখা দুজন ডাকাত দেখে অবাক না হয়ে পারিনি। দেখতে সুঠাম দেহের অধিকারী। লম্বায় ছয় ফুট হবে। তারা দুই ভাই। তারা ডাকাতি করতে গিয়ে কোনো খারাপ কাজ করতে বাকি রাখেননি। ডাকাতি করতে গিয়ে নারীর সম্ভ্রম লুট করাও ছিল তাদের নেশা। এ ডাকাতদের অত্যাচারে চরের মানুষদের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। তারা ছিল খুবই ভয়ংকর ধরনের ডাকাত। ডাকাতির সঙ্গে সঙ্গে নারীদের ওপর জুলুম করায় এলাকায় মানুষ তাদের ওপর খুবই ক্ষিপ্ত ছিল। তাই এলাকার সবাই একজোট হয়ে ডাকাত ধরার পলিকল্পনা সাজায়। একদিন ডাকাতরা ডাকাতি করতে এলে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা এলাকাবাসী ডাকাতির কথা মাইকিং করে তাদের ধরে ফেলে। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত ছিল ডাকাতদের ধরে মেরে ফেলা হবে না। তাদের চোখ তুলে এবং পা কেটে জীবন্ত রেখে সাজা দেওয়া হবে।
এক ডাকাতের দুটি চোখ উপড়ে ফেলা হয়। তার হাত এবং পা কাটেনি। তার আরেক ভাইয়ের দুটি পা এবং চোখ তুলে দিয়েছে এলাকাবাসী। তার পা কাটা এবং চোখ তুলে ফেলার কারণ হলো- সে ডাকাতই ছিল খুবই ভয়ংকর এবং নিষ্ঠুর। তাদের বাড়ি ছিল বরিশালের মুলাদী এলাকায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি খেয়াঘাটে এসে এখন একজন মানুষের কাছে হাত পেতে খায়। আরেক ভাই একটি দোতারা নিয়ে খেয়া নৌকায় উঠে যাত্রীদের গান শুনিয়ে কিছু পয়সা উপার্জন করেন। সে ডাকাত ট্রলার ছাড়ার পরই দোতারায় গান তুলেন- ‘আল্লাহ আমার ভাগ্যে লেখার সময় তার কলমে কালি ছিল না’। এভাবেই দুজন ডাকাতের করুণ গল্পের ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। আর যারা এ ডাকাতদের একেবারে মেরে ফেলেনি তারাও এভাবেই ডাকাতদের তিলে তিলে জীবনে শাস্তি দিয়ে মারতে চেয়েছিলেন, আজ তাদের সে আশাও পূরণ হয়েছে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)