মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানে গেলে ভ্রমণকারীদের চোখে যেটা পড়বেই; তা হলো সোনার দাঁত। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা বাজারে ঘুরতে গেলে দেখা যায়, কোনো বয়স্ক নারী হাসলে তার দাঁতের ফাঁকে ঝলমল করে ওঠে সোনালি আভা। স্থানীয়দের কাছে এটি খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং বহু বছর ধরে এই দৃশ্য তাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে।
এক সময় উজবেকিস্তানসহ আশপাশের অঞ্চলে সোনার দাঁত ছিল সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কারও মুখে যত বেশি সোনার দাঁত দেখা যেত, তাকে তত বেশি সম্পদশালী বা প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা হতো। তাই অনেকেই এটিকে কেবল চিকিৎসা বা সাজসজ্জার বিষয় হিসেবে দেখতেন না। এটি ছিল তাদের কাছে সমাজে নিজের অবস্থান প্রকাশের একটি দৃশ্যমান উপায়।
তবে এই প্রবণতার পেছনে শুধু সামাজিক ভাবমূর্তি তুলে ধরাই কাজ করেনি। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সেই সময়কার বাস্তব জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও। সোভিয়েত আমলে অনেক সাধারণ মানুষের ব্যাংকের ওপর আস্থা কম ছিল। অর্থনীতি ছিল অনিশ্চিত, আর ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিল নানা শঙ্কা। ফলে অনেকেই এমন কোনো উপায় খুঁজতেন, যাতে নিজের সম্পদ নিরাপদে নিজের কাছেই রাখা যায়।
এই জায়গায় সোনার দাঁত এক ধরনের কার্যকর সমাধান হয়ে ওঠে। কারণ সোনা তো মূল্যবান ধাতু, আর সেটি যদি দাঁতের সঙ্গে বসানো থাকে, তাহলে তা সবসময় নিজের শরীরের সঙ্গেই থাকবে। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও কম। তাই অনেকের কাছে এটি ছিল এক ধরনের বহনযোগ্য সঞ্চয়, যা সবসময় নিজের সঙ্গেই থাকে। এছাড়া তখনকার দন্তচিকিৎসার বাস্তবতাও এই প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সোভিয়েত যুগে আধুনিক দাঁতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অনেক উপকরণ সহজে পাওয়া যেত না। আজকের মতো সিরামিক, টাইটানিয়াম বা উন্নত কৃত্রিম দাঁত তখন এতটা প্রচলিত ছিল না। ফলে চিকিৎসকরা অনেক সময় দাঁতের বিকল্প হিসেবে সোনাই ব্যবহার করতেন। সোনা টেকসই, মরিচা ধরে না এবং দাঁত হিসেবে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। এই কারণেও এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত, মানুষ শুধু নষ্ট বা ভাঙা দাঁতের জায়গায় নয়, বরং সুস্থ দাঁত তুলেও সেখানে সোনার দাঁত বসাতেন। কারণ এতে তাদের সামাজিক অবস্থান চোখে পড়ার মতো প্রকাশ পেত। বিশেষ করে বয়স্ক নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা গেলেও পুরুষদের মধ্যেও এর ব্যবহার ছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও এই অভ্যাস একেবারে হারিয়ে যায়নি। মধ্য এশিয়ার অনেক অঞ্চলে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক অবস্থা ততটা উন্নত ছিল না। ফলে আগের অভ্যাস অনেকটাই বজায় ছিল, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা অপেক্ষাকৃত কম উন্নত এলাকাগুলোতে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আধুনিক দন্তচিকিৎসার প্রসার এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবের কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সোনার দাঁতের ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। এখন অনেকেই স্বাভাবিক রঙের সিরামিক বা আধুনিক কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এগুলো দেখতে প্রাকৃতিক দাঁতের মতো হওয়ায় নান্দনিকতার দিক থেকেও বেশি গ্রহণযোগ্য।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)