চলতি বছরের বোরো চাষ মৌসুম থেকে নতুন সেচ নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে বোরো ধানের চাষাবাদ কমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখতে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পানি সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের ১০ হাজারের বেশি জমিতে ধান চাষ করতে পারেননি কৃষকরা। তারা জানিয়েছেন, পানির অভাবের কারণে চাষ করা সম্ভব হয়নি। এতে রাজশাহী অঞ্চলে ধানের উৎপাদন কমছে। তবে ধান চাষ কমলেও অন্য ফসলের আবাদ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ মিলে রাজশাহী বিভাগের কৃষি অঞ্চল গঠিত। ২০২৩- ২৪ অর্থবছরে এ অঞ্চলে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৬৫ হেক্টর বেশি জমিতে চাষ হয়েছিল। তবে ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানি সংকটের কারণে চাষ হয়েছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে। এতে গত অর্থবছরের তুলনায় এবার ১০ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে কম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীতে ১ হাজার ৯০৫ হেক্টর, নওগাঁয় ৫৪০ হেক্টর, নাটোরে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে কম চাষ হয়েছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) তথ্য অনুযায়ী, পানি সংকটপূর্ণ আট উপজেলায় সংস্থাটির ৩ হাজার ৫৮৮টি সচল গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৬০টি নলকূপ তীব্র পানি সংকটপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নলকূপ ২৪ থেকে ৪০ হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করতে পারে।
বিএমডিএর নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখতে বছরে একটি গভীর নলকূপ সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৬০ ঘণ্টা চালানো যাবে। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বোরো মৌসুমে চালানো যাবে ৯৮০ ঘণ্টা। এতে এসব নলকূপের আওতায় থাকা জমিতে বোরো ধানের চাষ অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকে বা শূন্যে নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোদাগাড়ী উপজেলার বিএমডিএর একজন নলকূপ অপারেটর বলেন, ‘আমার এলাকায় যে জমি আছে, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগে পানি দিতে পারছি। অফিস থেকেও তেমনই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে অনেকেই এবার ধানের চাষ করতে পারেননি।’
গোদাগাড়ী উপজেলার কালিদিঘি গ্রামের কৃষক মো. মামুন বলেন, ‘বোরো ধান চাষ করার জন্য দুই মাস আগে বীজতলা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু চাষ করতে পারিনি। চারা রোপণের ১৫ দিন আগে শুনলাম- আমাদের ১০ বিঘা জমির মধ্যে তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারব। তাই করেছি।’
পুরভারা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবার ১২ বিঘা জমি দেড় লাখ টাকার ওপরে লিজ নিয়েছি। লিজ নেওয়ার পর শুনি, দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারব। এতে আমার বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। এখন আর কী করার, পানি না দিলে তো ধান হবে না। তাই বাকি জমিতে অন্য কিছু চাষ করতে হবে।’
শেখেরপাড়া গ্রামের মো. আউয়াল বলেন, ‘আমি এক বিঘা জমি থেকে যে পরিমাণ ধান পাই, তা দিয়ে আমার সারা বছর চলে যায়। কিন্তু এবার বাইরে থেকে চাল কিনে খেতে হবে।’
বিএমডিএর চেয়ারম্যান ড. মো. আসাদ উজ জামানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ধানের চাষ কমলেও অধিক হারে সরিষার চাষ হয়েছে। আশা করছি, এগুলো সামনের আউশ মৌসুমে এসে ঘাটতি পূরণ করবে।’