টাঙ্গাইলের বাজারে উঠেছে জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) স্বীকৃত মধুপুরের আনারস। চাহিদা বেশি হলেও লাভ পাচ্ছেন না চাষিরা। সারের দাম বেশি হওয়ায় খরচ উঠছে না তাদের। পাইকারি বিক্রিই বেশি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে এই আনারস। চাষিরা চান প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। কৃষি বিভাগ জানায়, আনারস থেকে খাদ্যপণ্য তৈরির কারখানা গড়ার পরিকল্পনা আছে। চলতি মৌসুমে ২০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
গারোবাজার গ্রামের আনারস চাষি বিশ্বাস শেখ জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৪ বিঘা জমিতে আনারস চাষে লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন। ক্যালেন্ডার জাতের প্রতিটি আনারস বিক্রি করছেন ১৫ থেকে ৪০ টাকায়। কিন্তু সারসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তেমন লাভ হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সারের দাম অনুযায়ী আনারসের দাম পোষায় না। যদিও গতবারের চেয়ে এবার দাম একটু বেশি, তাও তেমন লাভ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যান, তাই খুচরার চেয়ে পাইকারি বিক্রিই বেশি হয়।’
প্রান্তিক চাষিরাও একই হতাশা জানিয়ে বলেন, ‘আনারস চাষিদের জন্য যদি সারের দামটা একটু কমিয়ে রাখা হতো, তাহলে ভালো হতো। আনারসের যে দাম, আর সারের যে দাম- এ দামে কৃষকের আসলে পোষায় না।’ সরকারের কাছে তাদের দাবি, ‘সারের দাম কমাতে হবে।’
আনারস ব্যবসায়ীরা জানান, টাঙ্গাইলের আনারস চলে যাচ্ছে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাদের মতে, ‘দাম এখন কিছুটা কম। তবে বাজারে আমসহ অন্যান্য ফল কমে গেলে আনারসের দাম বাড়বে।’
গারোবাজারে প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ পিস আনারস। স্থানীয়ভাবে বড় ও খুচরা ব্যবসায়ী মিলিয়ে আছেন প্রায় ৩০০ জন। কিন্তু সঠিকভাবে বাজারজাতকরণের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করে না বলে জানান তারা। এক আনারস ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা যাতে সঠিকভাবে আনারস বাজারজাত করতে পারি, সে বিষয়ে কেউ কোনো পরিকল্পনা নেয়নি।’
রাজশাহী থেকে আসা এক আনারস ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের জেলায় আমের চাহিদা অনেক, তবে আনারসের তেমন চাষ নেই। তাই মধুপুর থেকে কিনে এনে বিক্রি করি। এখানকার আনারস দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে ভালো ব্যবসার পরিকল্পনা করছি।’
আকাশ চন্দ্র নামে টাঙ্গাইল শহর থেকে আসা এক ক্রেতা বলেন, ‘মধুপুরের দিকে গেলে বাড়ির লোকজন বলে, আনারস আনতেই হবে। তারা শুধু মধুপুরের আনারস খায়। কারণ এখানে ফরমালিন দেওয়া হয় না, খেতে ভালো লাগে।’
তবে গারোবাজারের ইজারাদার জুলহাস উদ্দিন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আগে আনারস প্রাকৃতিকভাবে পাকত। ফলে ফল মিষ্টি হতো। কিন্তু এখন অনেকেই ফরমালিন ব্যবহার করছে, এতে গুণগত মান কমে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজারে দেশের প্রায় ৪০টি জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন। মধুপুরের আনারস সারা দেশে চাহিদাসম্পন্ন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই স্বীকৃতি পাওয়া আনারসের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আজিজুল হক বলেন, ‘আনারসের জিআই স্বীকৃতি একটি বড় অর্জন। টাঙ্গাইলের তিনটি পণ্য আনারস, চমচম ও তাঁতের শাড়ি-এই স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন আনারসকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে।’
টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, ‘সরকারিভাবে আমাদের আনারস নিয়ে পরিকল্পনা আছে। সিজনের সময় অতিরিক্ত আনারসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আনারস থেকে খাদ্যদ্রব্য তৈরির কারখানা করার পরিকল্পনা আছে।’
চলতি মৌসুমে জেলায় ৭ হাজার ৭৯৪ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৭২ হাজার ৭৯০ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গারোবাজার, জলছত্র, মোটেরবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ১৫ লাখ পিসের বেশি আনারস। দৈনিক এ বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মৌসুম শেষে আনারস বেচাকেনা থেকে অন্তত ২০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। তবে লাভবান হতে হলে দরকার সঠিক বাজারব্যবস্থাপনা, সারের দাম কমানো এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন। আর এসব বাস্তবায়নেই টিকে থাকবে মধুপুরের আনারসের ঐতিহ্য।