সাতক্ষীরার উপকূলীয় ঘেরপাড়ে লোনা পানির ধারের সরু আইলগুলো একসময় ফাঁকা পড়ে থাকত। আজ সেই জায়গায় ঝলমল করছে লাল-সবুজ টমেটো। জলবায়ুর চাপে অন্যান্য ফসল টিকতে না পারলেও কৃষকের কৌশল, উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তি এই আইলগুলোকে সফল টমেটোর খেতে রূপ দিয়েছে।
জেলায় এবার গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৩২০ টন। বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও কৃষকের উদ্ভাবনী উদ্যোগ উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ঘেরের লোনা পানি ওঠা সরু আইলগুলো দীর্ঘদিন অনাবাদি ছিল। ধান বা শাকসবজি চাষ করা যেত না। অনিয়মিত বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, তীব্র রোদ আর লবণাক্ততা জমিকে দ্রুত নষ্ট করত। গত দুই-তিন বছরে কৃষকরা এসব আইলে উঁচু বেড বানিয়ে গ্রীষ্মকালীন টমেটো লাগাতে শুরু করেন। এতে শিকড় লবণাক্ততা থেকে রক্ষা পায় এবং গাছ সুস্থ থাকে। কলারোয়া, তালা, দেবহাটা ও সদরের মাঠে দেখা যায় সারি সারি টমেটো গাছ। পলিথিন শেডের নিচে রোগবালাই কম থাকে।
অসময়ে টমেটোর দাম বেশি হওয়ায় লাভও বাড়ছে। কলারোয়া উপজেলার চাষি আলী রশিদ জানান, এক বিঘায় খরচ প্রায় দুই লাখ টাকা। বাজার ভালো থাকলে বিক্রি হয় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো। তার ভাষায়, ‘খরচ বাদ দিলে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ থাকে।’
তালা উপজেলার নগরঘাটার কৃষক আব্দুর রশিদ জানান, তার দুই বিঘায় এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। মিঠাবাড়ির কৃষক আবেদ আলী তিন বিঘায় টমেটো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম জাত তুললে মোটা অঙ্কের আয় হয়।’
দেবহাটার পাঁচপোতাবিল এলাকার বদরুল ইসলাম বলেন, ‘পলিথিন শেডে খরচ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সুবিধা বেশি। গরম কম লাগে, বৃষ্টি হলেও ক্ষতি হয় না, রোগবালাইও কম।’ ঘেরপাড়ের এই চাষ অনেক পরিবারকে আবার কৃষিতে ফিরিয়েছে।
টমেটো চাষে শ্রমিকের আয়ও বেড়েছে। কলারোয়ার শ্রমিক সামছুল আলম বলেন, ‘আগে ঘেরে কাজ কম ছিল। এখন টমেটো চাষে নিয়মিত আয় হয়।’
দেশে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে টমেটোর চাহিদা বেশি। আমদানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ২২ হাজার ৪১৬ টন টমেটো। বাজারমূল্য প্রায় ১৪০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করেন, স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানি কমবে এবং দাম স্থিতিশীল হবে।
কলারোয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম এনামুল ইসলাম জানান, বারি-৮ জাতের টমেটো স্বাদে ভালো, টেকসই এবং চাহিদাসম্পন্ন। তার উপজেলায় ৯৩ হেক্টর জমিতে এই জাতের চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এক বিঘায় খরচ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। বিক্রি হয় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকায়। লাভ থাকে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর চাপ মোকাবিলায় সাতক্ষীরার কৃষকরা দ্রুত অভিযোজন সক্ষমতা দেখিয়েছেন। উঁচু বেড, ড্রিপ সেচ, পলিথিন শেড, হাইব্রিড জাত ও লবণাক্ততা-সহনশীল বীজ ব্যবহার করে তারা ফলন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাতক্ষীরায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ এবার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো।’ তিনি জানান, ‘জলবায়ুর ঝুঁকি বাড়লেও কৃষকরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা কাটিয়ে উঠছেন। কলারোয়া ও তালায় ফলন বিশেষভাবে ভালো।’ তার ভাষায়, ‘সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারলে ঘেরাঞ্চল জাতীয় বাজারেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।’
তিনি আরও জানান, ‘চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্য ৫ হাজার ৩২০ টন, বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।’ তার মতে, সাতক্ষীরার এই সাফল্য দেশের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকার জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।