যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি যেন এক নীরব দর্শক। যেখানে অতীত আর বর্তমানের গল্প ফিসফিসিয়ে বলে যায়। বাইরে থেকে তাকালে বোঝা যায় না, ভেতরে কত গল্প আর জ্ঞান জমা আছে।
গ্রন্থাগারের ঠাণ্ডা বাতাসে ভেসে বেড়ায় পুরোনো পৃষ্ঠা উল্টানোর এক মৃদু শব্দ। তারই মাঝে এক আক্ষেপ, যেন পুরোনো বইয়ের পাতাগুলো জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা আমাদের ভুলে গেলে কেন?’ ধুলো জমে থাকা বইয়ের সারির ভেতর কেমন এক আক্ষেপ ভাসে, যেন পুরোনো পৃষ্ঠাগুলো গুনগুন করে বলে ওঠে, ‘তোমাদের মননশীলতার আকাশে আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি।’ বাইরে থেকে তাকালে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরের শীতল বাতাস যেন সময়ের গল্প বুনে চলে। পাঠক আসে, ফিরে যায়, কেউ কেউ রেফারেন্সের পাতা থেকে তুলে নেয় কঠিন সব তথ্যের ভাণ্ডার। কিন্তু সাহিত্য যেন অপেক্ষায় থাকে তার পাঠকের জন্য অধীর আর ব্যাকুল হয়ে।
যবিপ্রবির হৃৎপিণ্ড এই গ্রন্থাগারের ১৫ হাজার ৬২৮টি বইয়ের সাজানো সারিতে চোখ বুলালে দেখা মেলে বিপুলসংখ্যক জ্ঞানগর্ভ বই, যেগুলোয় সমৃদ্ধ হয়ে আছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত, সমাজবিজ্ঞান থেকে শুরু করে নানা বিষয়। লাইব্রেরির সংগ্রহে রয়েছে আন্তর্জাতি কমানের প্রকাশনার বই ও জার্নাল। এসব বই শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেফারেন্স বইয়ের পাশাপাশি এখানে শিল্প-সাহিত্যের বইয়ের সংখ্যাও কম নয়।
আলাদা একটি কর্নারে শিল্প-সাহিত্যের সংগ্রহশালাও রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও কবিতার বই। একসময় ছিল যখন কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ-সবকিছুই ছিল মনের খোরাক। মন বসে বসে আঁকত নতুন দিগন্ত, চেতনার পালে লাগত নতুন বাতাস। কিন্তু কালের স্রোতে হয়তো এসব কিছু পিছিয়ে পড়েছে।
একালের শিক্ষার্থীদের চাহিদা বদলেছে, তারা হয়তো সৃজনশীলতাকে একটু একটু করে ভুলে যাচ্ছে। তথ্যের অগাধ ভাণ্ডারে ডুবে গিয়ে তারা যেন ভুলতে বসেছে কল্পনার সেই রাজ্য, যেখানে একজন পাঠক চরিত্রের সঙ্গে হাসত, কাঁদত এবং জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে পেত।
লাইব্রেরির কোণে বসে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেছে, তার হাতে একটি রেফারেন্স বই। কথার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাঠ্যবইয়ের চাপ অনেক বেশি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, সময় কোথায় একটু গল্পের বই পড়ার? তবে সাহিত্যের বইগুলো দেখতে ভালো লাগে, যদি সময় থাকত, তাহলে পড়তাম।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রকিবুল হাসান বলেন, ‘একসময় খুব সাহিত্যের বই পড়তাম। ছোটবেলায় অনেক গল্পের বইপড়া হতো। এখন পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের চাপে সময় পাই না। তবে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ এখনো আছে। লাইব্রেরিতে নতুন সাহিত্য কর্মশালা হলে বা গল্পের বই নিয়ে কিছু আয়োজন হলে হয়তো আবার সেই আগ্রহ ফিরে আসবে।’
শেখ সাদী ভূঁইয়া নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের গ্রন্থাগারে নিয়মিত সাহিত্যের কর্মশালা বা বই আলোচনা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হবে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই বা রেফারেন্স বই নিয়েই সীমাবদ্ধ না থাকুক, বরং সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে পা রাখুক। মননশীলতার বিকাশ ঘটুক।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের গ্রন্থাগারটি যেকোনো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই সমৃদ্ধ। শিক্ষার্থীরা এখানে নিয়মিত রেফারেন্স বই নিতে আসেন। তবে সাহিত্যচর্চা এখানে একেবারেই কম।
আমাদের কাছে অনেক ভালো সাহিত্যের বই রয়েছে। কিন্তু খুব কম শিক্ষার্থী সেগুলো নিতে আগ্রহী। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা নিয়মিত সাহিত্যচর্চা শুরু করুক।
তারা যত বেশি আগ্রহী হবে, আমরা তত বেশি নতুন নতুন বই সংযুক্ত করতে পারব। তারা লাইবেরিতে আসতে শুরু করলে লাইব্রেরিও সমৃদ্ধ হবে।’