চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচনের মাঠে এখন মূলত তিনটি পক্ষের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে- ছাত্রশিবির, ছাত্রদল ও স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের প্যানেল।
দীর্ঘ ছত্রিশ বছর পর এ নির্বাচন ঘিরে পুরো ক্যাম্পাসে এখন উৎসবমুখর উত্তেজনা, তবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গাঢ় রঙ । ভিপি ও জিএস-এ দুটি শীর্ষ পদকে ঘিরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে।
ছাত্রশিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে “সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট” নামে। প্যানেলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ভিপি পদে ইব্রাহিম হোসেন রনি ও জিএস পদে সাঈদ বিন হাবিব।
ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানো এবং বিভিন্ন হল সংসদে প্রভাব ধরে রাখার কারণে এ প্যানেলকে তুলনামূলক শক্তিশালী মনে করা হচ্ছে। তাদের ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন সমস্যা সমাধান ও পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর সময় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে, যা নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে।
অন্যদিকে ছাত্রদলও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্যানেলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় ও জিএস প্রার্থী শাফায়াত হোসেন। যদিও সংগঠনের অভ্যন্তরে কিছু কোন্দল প্রকাশ পেয়েছে এবং একজন নেতা বহিষ্কৃত হয়েছেন, তবু মূল নির্বাচনি প্রচারণায় তারা বেশ সক্রিয়। শহর ও বিভাগের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের সহযোগিতায় প্যানেলটি ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে কাজ করছে। তারা নিজেদের প্রচারণায় দাবি করছে, ‘এ নির্বাচন পরিবর্তনের সূচনা করবে’-এমন স্লোগানকে সামনে রেখেই তারা কাজ করছে।
তৃতীয় দিকে রয়েছে স্বতন্ত্র ও শিক্ষার্থীভিত্তিক প্যানেলগুলো। এর মধ্যে ‘বিনির্মাণ শিক্ষার্থী ঐক্য’, ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ ও ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে কয়েকটি প্যানেল আলোচনায় এসেছে। এ প্যানেলগুলোর অধিকাংশই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রত্যক্ষ ছায়ায় নয়, বরং স্বাধীন শিক্ষার্থী উদ্যোগে গঠিত। তাদের ইশতেহারে একাডেমিক জবাবদিহি, ক্যাম্পাসের গণপরিবহন সংকট নিরসন, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাদের প্যানেলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, বিশেষ করে জিএস ও এজিএস পদে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে লড়াইয়ের আবহও আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রতিটি প্যানেল প্রচারণায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে- লিফলেট, প্রচারণামূলক গান, পোস্টার, এমনকি ফেসবুক বুস্ট ব্যবহার করে প্রার্থীরা পৌঁছে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের কাছে। নারী ভোটারদের মন জয় করাও প্রতিটি প্যানেলের অন্যতম টার্গেট, কারণ মোট ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। ফলে প্রায় সব প্যানেলই নারী-বান্ধব ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে প্রশাসনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি সম্পন্ন। যদিও নির্বাচনের পরিবেশ এখনো তুলনামূলক শান্ত, তবু অভিযোগ- পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
ছাত্রশিবির বলছে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, ছাত্রদল বলছে প্রশাসন নিরপেক্ষ নয়, আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করছে- দুই বড় রাজনৈতিক শক্তির কারণে তাদের প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ চাকসু নির্বাচন এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। শিবির, ছাত্রদল ও স্বতন্ত্র প্যানেলের এ ত্রিমুখী লড়াই এখন পুরো ক্যাম্পাসের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কে জিতবে- তা নির্ধারণ হবে ভোটারের ভোটে। কিন্তু এর আগেই ছাত্ররাজনীতির মাঠে এক রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা দেখেছে শিক্ষার্থীরা।
রিফাত/