শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) উদ্যোগে এবং মেন্টাল হেলথ ক্লাব রাজশাহী ইউনিভার্সিটির (MHCRU) সহযোগিতায় মাসব্যাপী এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা হাফছা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাকসু এবং MHCRU-এর সহযোগিতায় হলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু আবাসিক ও অনাবাসিক উভয় শিক্ষার্থীই কোনো না কোনো হলে সংযুক্ত, তাই ক্যাম্পেইনটি হলভিত্তিক পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পেইন পরিচালনার ধরন
মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইনটি পরিচালিত হবে দুইটি সেগমেন্টে।
প্রথম সেগমেন্ট: নির্ধারিত বুথে শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ধাপে বিনামূল্যে মেন্টাল হেলথ চেক-আপ (যেমন ডিপ্রেশন লেভেল, এংজাইটি, স্ট্রেস, হোপলেসনেস, ইন্টারনেট এডিকশন, আত্মহত্যা ঝুঁকি ইত্যাদি) পরিচালিত হবে। এই চেক-আপ কার্যক্রম সকাল ৯:৩০টা থেকে বিকাল ৪:০০টা পর্যন্ত চলবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবেন তারা কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন কিনা বা মানসিক ঝুঁকিতে আছেন কিনা।
দ্বিতীয় সেগমেন্ট: সংশ্লিষ্ট হলের সব শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হবে। ওয়ার্কশপটি চলবে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬:৩০টা পর্যন্ত। এই সেশনে মানসিক স্বাস্থ্য কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সহায়তা কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে আশেপাশের মানুষদের মানসিকভাবে সহায়তা করা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও ট্যাবু দূরীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাইকো-এডুকেশন প্রদান করা হবে।
আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট হলে ক্যাম্পেইন শুরু হবার আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। ক্যাম্পেইনটি ১৭টি হল ও ১টি ডরমেটরি সহ মোট ১৮টি পয়েন্টকে ৬টি ক্লাস্টারে ভাগ করে পরিচালিত হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধাসমূহ- নির্ধারিত বুথে দুই ধাপে বিনামূল্যে মেন্টাল হেলথ চেক-আপের সুযোগ; নিজের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে প্রাথমিক মূল্যায়নের সুযোগ; মানসিক ঝুঁকি বা সমস্যার ক্ষেত্রে প্রফেশনাল স্ক্রিনিং ও দিকনির্দেশনা; মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও জ্ঞান বৃদ্ধি; ইন্টারঅ্যাকটিভ মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের সুযোগ; মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সাপোর্ট সার্ভিস ও রেফারাল সংক্রান্ত তথ্য;বন্ধু ও সহপাঠীদের মানসিকভাবে সহায়তা করার প্রয়োজনীয় স্কিল অর্জনের সুযোগ; মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার, ভ্রান্ত ধারণা ও ট্যাবু দূরীকরণে সহায়তা এবং একটি নিরাপদ, গোপনীয় ও বিচারহীন পরিবেশে নিজের কথা প্রকাশের সুযোগ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, গত বছরের শেষ দিকে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ১২ নভেম্বর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানা এবং ৩১ ডিসেম্বর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নামিস নওরীন পুষ্পিতা আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নাজুক মানসিক অবস্থার চরম বহিঃপ্রকাশ।
জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানও আমাদের উদ্বিগ্ন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশে প্রতি বছর ১০–১১ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অথচ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী দেশের ৯২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৯৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। পর্যাপ্ত সচেতনতা এবং ‘ট্রিটমেন্ট গ্যাপ’-এর কারণে অনেকেই জানেন না তাদের মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হলোকাম্পাসে একটি বিচারহীন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে তাদের মানসিক কষ্টের কথা বলতে পারবে। আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক সময়ে সঠিক সচেতনতা এবং ইন্টারভেনশন সোনিয়া বা লামিসার মতো আর কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া রোধ করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক এস এম সালমান সাব্বির, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা হাফছা, সহ মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সামিয়া জাহান, সহ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মাসুমা ইসরাত মুমু সহ MHCRU-এর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শাকিবুল/রিফাত/