‘গত ৪০ বছরেও আমি এরুম পানি দেহি নাই। যেদিকে চোখ যায় পানি আর পানি। মাইনসের ঘরবাড়ি সব পানির তলে। চোখের সামনে দিয়া ঘরের মালামাল ভাইস্যা যাইতেছে। নিজের ঘর ছাইড়া মাইনসের এহানে গিয়া ঠাঁই লইছে। মাইনসের এইসব দুঃখ-কষ্ট দেইখা আমার মন কান্দে। যদিও আমার নিজের ঘরটাও এহন পানির তলে।’
কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার নানুয়ার বাজার এলাকার বাসিন্দা পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধ সুরুজ মিয়া। গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের গ্রাম বুড়বুড়িয়া অংশে গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে অন্যদের সঙ্গে তার নিজের ঘরটিও তলিয়ে যায়। তখন রাতের বেলা। অন্যদের সহযোগিতায় ক্রেচে ভর দিয়ে চলাচল করা মানুষটি ঠাঁই এখন নদীর পাড়ে। কিন্তু বন্যা আক্রান্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর হাহাকার দেখে নিজের ঘরের বেদনাই ভুলে গেছেন তিনি। পরে ক্রেচে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসেন অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গা কালখারপাড় এলাকায়। কিন্তু এসে দেখেন, পুরো অঞ্চল পানিতে ডুবে গেছে।
বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দুই দিক দিয়ে গোমতী নদী এবং সালদা নদীর ভাঙনের ফলে এই দুই উপজেলার মানুষই বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। দুই অঞ্চলের কোনো দিক দিয়ে পানি সরে যাওয়ার জায়গা না থাকায় বিপদ বেড়েছে মানুষের। পানি উঠছে ফুলে ফেঁপে।
সুরুজ মিয়ার ভাষ্য, ৬০-৬৫ বছরের জীবনে এত বন্যা দেখেছেন। তবে এবারের মতো পানি কোনো বছরই দেখেননি। একই কথা বলছিলেন, বুড়িচং উপজেলার মহিষিমারা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব আব্দুস সাত্তার। তিনি বলেন, ‘নদী ভেঙে পানি বাড়তে থাকার পর আমি ও আমার স্ত্রী ঘরে আটকা পড়ি। আমার জীবনে কখনো এত পানি দেখিনি। ভয়ে প্রায় মরে গিয়েছিলাম। পরে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন। ভেবেছিলাম হয়তো মরেই যাবো।’
কুমিল্লার বুড়িচং অংশে গোমতী নদীর বাঁধ এবং ব্রাহ্মণপাড়া অংশে সালদা নদী ভেঙে যাওয়ায় এই দুই উপজেলার মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। তবে সময় যত যাচ্ছে, বন্যার পানিও বাড়ছে হুহু করে। দুই নদীর মাঝখানে প্লাবিত হচ্ছে দুই উপজেলার শতাধিক গ্রাম। নদীভাঙনের সর্বোচ্চ ক্ষতির শিকার হয়েছে বুড়িচং উপজেলার উত্তর-পূর্বের ৫টি ইউনিয়ন। আর ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮ ইউনিয়নের সব কয়েকটি প্লাবিত হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবেদ আলী বলেন, ‘গোমতী ও সালদা নদীর ভাঙনের ফলে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্লাবিত হয়ে যায়। দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।’