চট্টগ্রামে বন্যার পানি নামার পর বেরিয়ে আসছে ক্ষতচিহ্ন। পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে সড়ক। ভেঙে গেছে কাঁচা বসতঘর। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু।
চট্টগ্রামে শুধু কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ পৌণে ৭০০ কোটি টাকা। রাস্তা-ঘাট অবকাঠামো এবং বাড়ি ঘরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু করেছে প্রশাসন। তবে এই খাতেও ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ফটিকছড়ি উপজেলাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০৬ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের এডিসি (জেনারেল) রাকিব হাসান খবরের কাগজকে বলেন, তারা এতদিন বন্যায় পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। পানি নেমে যাওয়ার পর এখন ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণের কাজ শুরু করেছেন। তা শেষ করতে আরও কয়েকদিন লেগে যেতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা পরিস্থিতি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ফটিকছড়ি উপজেলার ৩০ হাজার ২০০ পরিবারের দেড় লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিরসরাই উপজেলায় ২৫ হাজার পরিবারের এক লাখ মানুষ, সীতাকুণ্ডে ২৭০০ পরিবারের ১২ হাজার মানুষ, হাটহাজারীতে ২০০ পরিবারের ৬০০ মানুষ, বোয়ালখালীতে ১৮০ পরিবারের ১৫০০ মানুষ, বাঁশখালীতে ১৭৫০ পরিবারের ৮৭৫০ মানুষ এবং রাউজানে ১০৮ পরিবারের ৩০০০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুচ ছোবহান বলেন, চট্টগ্রামে আকস্মিক বন্যায় ফলন আসার আগ মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেছে আমন ধান। আর্থিকভাবে বিশাল অংকের ধাক্কা খেয়েছেন কৃষকরা। ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৭ জন কৃষক পরিবারের আর্থিক ক্ষতি ৩৯১ কোটি ৮৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা।
চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় আমান আবাদে ৭৫ হাজার ৫৪০ ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারের ২৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৪২৪ হাজার টাকা। আমনের বীজতলাতে ৩৯ হাজার ২০৩ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭ কোটি ৭৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। আউশ আবাদে ২৩ হাজার ৬৭৪ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ কোটি ৩৩ লাখ ৯৪২ হাজার টাকা। শরৎকালীন সবজিতে ২২ হাজার ৬৫০ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আদা চাষে ৯৫ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। হলুদ চাষে ৯৪ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ লাখ ৯ হাজার টাকা, আখ চাষে ৫০ কৃষক পরিবারের ৬৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও পান চাষে ৬৫ কৃষক পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৪ লাখ ৫ হাজার টাকার। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৭ কৃষক পরিবার। তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৯১ কোটি ৮৬ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা। মোট ৫৮ হাজার ৪৯২ হেক্টর জমিতে ক্ষতি হয়েছে ৮৮ হাজার ৩৬৭ টন ফসল।
অপরদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ৫ হাজার ৫৪১ হেক্টর খামারের মাছ। ক্ষতি হয়েছে ২৯০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ জানান, চট্টগ্রামে বন্যায় মৎস্যখাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মীরসরাইয়ে ১৪২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই মুহুরী প্রজেক্টের। ফটিকছড়িতে ৩৩ কোটি, হাটহাজারীতে ২৩ কোটি, রাউজানে প্রায় ১০ কোটি টাকা। অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও কমবেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যে জানা যায়, বন্যায় ছোট-বড় ১৬ হাজার ৮৬৪টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মৎস্য খামারের মোট আয়তন ৫ হাজার ৫শ ৪১ হেক্টর। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ১৬ হাজার ৫শ ৯৫ টন মাছ, যার আনুমানিক ক্ষতি ২৮৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ১৪ লাখ পোনা যার ক্ষতি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ২ লাখ পিএল চিংড়ির লার্ভা যার মূল্য ৪ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে জেলার মৎস্য খাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
ফটিকছড়ি উপজেলাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৫০৬ কোটি টাকা
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় মাছের প্রজেক্ট, ক্ষেতের ফসল, গৃহপালিত প্রাণী, রাস্তা-ঘাট ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০৯ কোটি টাকা বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, ৬০০টি বসতঘর সম্পূর্ন ধসে পড়েছে। আংশিক ৪৮০০ টি যার ক্ষয়ক্ষতি ৯৬ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ক্ষতি ১২০ কোটি, মৎস্য খাতে ক্ষতি ৩৮ কোটি, রাস্তা, ব্রীজ/কালভার্ট ক্ষতি হয়েছে ২২৩ কোটি। হালদা, ধুরুং, সর্তাসহ নদী খালের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ক্ষতির হিসাবে ১৫ কোটি এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের হিসাবে টিউবওয়েল ও ল্যাট্রিন ১৪ কোটি টাকা, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজে ৮৮ লক্ষ, হাস-মুরগি ও প্রাণি খাদ্য ১ কোটি ৬৩ লাখ, বিদ্যুৎ বিভাগে ৮ লক্ষ ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলায় জমি প্লাবিত হয়েছে ২০ হাজার ৬১১ হেক্টর। ৩০ হাজার ৪৬৪ জন কৃষকের শাক-সবজি, ধানসহ ১২০কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় ফটিকছড়িতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ ৫০৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
মিরসরাই: মিরসরাইয়ে বন্যায় ঘর-বাড়ি, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ প্রায় ৮'শ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মৎস্য ও পোল্ট্রি শিল্পে। উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে আলাপ করে এতথ্য পাওয়া গেছে। তবে উপজেলা প্রশাসন এখনো ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করতে পারেন।
উপজেলার মুহুরী প্রজেক্ট এলাকার মাছ চাষী শেখ ফরিদ বলেন, আমার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। কিভাবে কি করবো কিছু বুঝে উঠতে পারছিনা। এরপর আবার শ্রমিকদের বেতন আছে খাদ্যর টাকা আছে।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রশাসক মাহফুজা জেরিন বলেন, আমরা এখনো তথ্য সংগ্রহ করছি। এখনো ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছেনা। তবে কয়েকদিনের ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
সীতাকুণ্ড: শুধু মৎস্য ও কৃষি খাতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৪ কোটি ৩২ লাখ টাকারও অধিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অন্যদিকে কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
এবারে বৃষ্টির পাশাপাশি সাগরের পানির উচ্চতাও ছয় ফুটের মতো বেড়ে যায়। জোয়ারের ঢেউয়ের ধাক্কায় বাঁশবাড়িয়া ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ঘোড়ামরা এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ও ফসলের মাঠে লবণাক্ত পানি ঢুকেছে। সৈয়দপুর এলাকায় ঢলের জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচার জন্য রিং বাঁধ কেটে দিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে সেখানেও কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকেছে। এসব এলাকার কৃষকেরা পরবর্তী সময়ে ভালো ফসল পাবেন কি না, এমন আশঙ্কায় রয়েছেন।
মুরাদপুর ইউনিয়নের কৃষক ফছিউল আলম বলেন, ৫০ শতক জমিতে মিষ্টি কুমড়া ও মরিচের চাষ করি। কিন্তু বন্যায় সব নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমার ১ লাখ বিশ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। একই ইউনিয়নের আরেক চাষি আবু তালেব বলেন, ২০ শতক জমিতে বরবটি, ঢেড়স, পরুলের চাষ করেছিলাম ঢলের পানিতে সব মরে গেছে। এতে ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ্ বলেন, উপজেলার সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড ও পৌর সদরের আংশিক এলাকার কৃষিজমি পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ডুবে মাছ চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডে মোট পুকুর রয়েছে ৬ হাজার ২০৪টি। এর মধ্যে ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০০টি। সব মিলিয়ে ২৩৪ হেক্টর পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, উপজেলার উত্তর অংশে পুকুরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে একটা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।