সীমান্তবর্তী উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম টিকইল। এখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস বেশি। তবে এ গ্রামটি সারা দেশে আলপনা গ্রাম নামে ব্যাপক পরিচিতি। বর্তমানে টিইকল গ্রামের নাম আলপনা গ্রাম না বললে মানুষ চিনতেই পারে না।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ি। বলা যেতে পারে এ গ্রামের প্রায় সব নারীরাই যেন এক একজন কারুশিল্পী। তারা নিজেদের বাড়ি-ঘর পরিপাটি রাখতে বিভিন্ন গাছের পাতাসহ খড়িমাটি দিয়ে মাটির দেয়ালগুলোতে পাখি ও ফুল এঁকে কারুকার্য ফুটিয়ে তুলছেন। বংশ পরম্পরায় বছরের পর বছর গ্রামের নারীরা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে আলপনা এঁকে আসছেন। হিন্দু অধ্যুষিত এ গ্রামের প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে হাতে আঁকা নানা আলপনা। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির দেয়ালই যেন একেকটি ক্যানভাস। মাটির তৈরি এসব বাড়ির ভেতরের-বাইরের কোনো দেয়ালই বাদ পড়ে না তুলির আঁচড় থেকে। রান্নাঘর থেকে শোবার ঘর এবং তুলসীতলাসহ প্রতিটি দেয়ালই মেয়েরা ভরে ফেলেন হাতে আঁকা আলপনায়। টিকইল তথা আলপনা গ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে আলপনা এঁকে সৌন্দর্য বর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে দেবতার সুদৃষ্টি ও আশীর্বাদ কামনা করেন। তবে গ্রামের গৃহিণী ও নারীরা দেয়ালগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলপনা আঁকেন পূজা-পার্বণ উপলক্ষে। আর এসব বর্ণিল আলপনা বছর ধরে শোভা পায় দেয়ালজুড়ে।
গ্রামের প্রথম আলপনা আঁকা বাড়ির গৃহিণী দেখন বর্মণ বলেন, ‘অনেক বছর থেকেই ঘরের দেয়ালে আলপনা সাজাতাম। এক পর্যায়ে গ্রামের সবাই নিজ নিজ বাড়িতে এ আলপনা আঁকা শুরু করে। আর এ থেকেই টিকইল গ্রামটি আলপনা গ্রামে পরিণত হয়েছে। আলপনাগুলো আঁকতে সাদা মাটি, লাল মাটি ও চুন দিয়ে প্রথমে দেয়াল লেপন করা হয়। পরে আতপ চালের গুঁড়া, খড়িমাটি, বিভিন্ন ধরনের রং, শুকনো বরই চুর্ণ আঠা, মানকচু ও কলাগাছের কস দিয়ে তৈরি রংয়ের মিশ্রণ দিয়েই আঁকা হয় এসব আলপনা। আর প্রতিটি পার্বণেই বাড়ি-ঘরের শোভাবর্ধনে চোখ জুড়ানো এসব আলপনা বাঙালি মেয়েদের শিল্পগুণের পরিচয়কেই তুলে ধরে। বছরে দুবার দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজায় বাড়ি সাজানো হয়। প্রতিদিন গ্রামটি দেখতে আসেন অনেকেই। দুর্গাপূজা উপলক্ষে গ্রামের সব মেয়ে বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।’
স্থানীয় অনিতা বর্মণ বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা এলে বাড়িতে আলপনা আঁকা শুরু হয়। সব বাড়িতে আলপনা থাকায় গ্রামটি আলপনা গ্রাম হয়ে গেছে। এখন অনেক ভালো লাগে। যে গ্রামটির নাম আগে কেউ জানতো না। এখন দেশ-বিদেশে সুনাম এনে দিয়েছে। নামটি শুনতে ভালোই লাগে। ভবিষ্যতে আরও কিছু দেখতে পাব। আর আলপনা গ্রামটি দেখে অন্য গ্রামেও যেন আলপনা তৈরি করে সবাই।’
অপর আলপনা শিল্পী প্রভাতী রানি, ধীরেন্দ্র বর্মণ, প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ জানান, গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষি কাজ করে খেয়ে পড়ে কোনো রকম আছেন। দারিদ্র্য থাকলেও তাদের বিশ্বাস, এ আলপনা দিয়েই তাদের ঘরে লক্ষ্মী আসে। টিকইল গ্রামের বউ-ঝিরা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে আলপনা এঁকে বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে দেবতার সুদৃষ্টি ও আশীর্বাদ কামনা করে থাকেন।
গ্রামবাসীর দাবি, গ্রামের প্রায় সব পরিবারই আলপনায় বাড়িঘর সাজায়। আলপনা গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সব পরিবারের জন্যই আর্থিকসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রয়োজন। বেশির ভাগ পরিবার ততটা সচ্ছল না হওয়ায় সবারই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।