‘আমরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করি। মুসলমানরা একপাশে তাদের মসজিদে নামাজ আদায় করেন, আর আমরা পাশের মণ্ডপে পূজা অর্চনা করে থাকি। কখনো কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিবাদ হয়নি। আশা করি, বাকি জীবনে এমনটা বজায় থাকবে।’
এভাবেই নিজেদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা জানাচ্ছিলেন নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলায় একপাশে মসজিদ আর অপর পাশে মন্দির অবস্থিত। প্রত্যেকে যে যার ধর্ম পালন করছেন। পাশাপাশি দুটি ধর্মীয় উপাসনালয় থাকা সত্ত্বেও কোনো দিন অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। এটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
১৯৮৫ সালে নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকায় পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এর কয়েক মাস পর তৈরি করা হয় মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মণ্ডপটি। তখন থেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন। এ এলাকার মানুষের মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই।
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা মণ্ডপে পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থী কলেজছাত্র অপু বিশ্বাস বলেন, ‘নড়াইলের মানুষ সব সময় একে অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়ে থাকে। এটি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সম্প্রীতির অটুট বন্ধন না থাকলে একই জায়গায় মসজিদে নামাজ আর মন্দিরে পূজা হতে পারে না। দেখে সত্যিই অনেক ভালো লাগল।’
মহিষখোলা পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের মুসল্লি মুফতি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘যার যার ধর্ম সে সে পালন করে। নামাজের সময় পূজার গান-বাজনাসহ আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ থাকে। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয়। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে এখানে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বসবাস করে আসছি। একই আঙ্গিনায় একপাশে মসজিদ, অন্যপাশে পূজার মণ্ডপ। আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে থাকি। আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির অটুট বন্ধন রয়েছে। প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা এ মণ্ডপে দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন পূজা করে আসছি। এখন পর্যন্তু কারও সঙ্গে কখনো সমস্যা হয়নি।’
মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা এনামুল হক বলেন, ‘আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, তারা তাদের ধর্ম পালন করে। এতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। এভাবেই বছরের পর বছর সবাই মিলেমিশে বসবাস করে আসছি।’
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নড়াইলে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ একত্রে বসবাস করে আসছে। এখানকার মানুষ সব সময় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। এর কারণে এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধন রয়েছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।’
এদিকে গত বুধবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে এ বছরের দুর্গাপূজা আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সব বয়সের মানুষ ধর্মীয় আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছেন। আগামী ১৩ অক্টোবর দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই উৎসব। এ বছর জেলায় ৫৬২টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ২৪৪টি, কালিয়া উপজেলায় ১৬৭টি এবং লোহাগড়া উপজেলায় ১৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।