সারাদেশে ডিমের মূল্য বৃদ্ধি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ডিমের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জ ডিম উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এখানেও ডিমের দাম চড়া। কিশোরগঞ্জের উৎপাদিত ডিম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলাতেও সরবরাহ করা হলেও এবার খামারিদের কাছ থেকেই বেশি দামে ডিম ক্রয় করতে হচ্ছে বলে বিভিন্ন ডিমের পাইকারি আড়তদাররা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ডিমের দাম বৃদ্ধির জন্য পাইকারি ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারণ ডিমের মূল্য বৃদ্ধির ফলে ডিমের চাহিদা অর্ধেক কমে গেছে।
সরেজমিনে বাজারের বিভিন্ন ডিমের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষদের বাজারের তালিকায় থাকে ডিম। প্রতি পিস ডিম ১৫ টাকায় কিনতে গিয়ে অনেকটাই হতাশ হয়ে ফিরে যায় তারা। বাজারের প্রতিটি পণ্য ও সবজি বাজারসহ মাছ, মাংস, চালের দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষ এখন বাজার কম পরিমাণে কিনছেন। অস্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়ার কারণে বাজার থেকে অর্ধেক ক্রেতারা ইতোমধ্যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে সবজির বিকল্প খুঁজে অনেকেই ডিম বেশি দামেই কিনে নিচ্ছেন। অনেকেই আবার এক হালি ডিম এক কেজি চালের সমপরিমাণ মূল্যের কথাও বলেছেন।
শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) জেলার বিভিন্ন স্থানে ডিমের পাইকারি আড়ত ও খুচরা ডিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে ব্রাউন লেয়ার মুরগির ডিম গত এক সপ্তাহে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তবে কৃষি বিপণন বিভাগ থেকে প্রতিটি ডিমের মূল্য ১১টাকা ৮৭ পয়সা বেঁধে দেওয়ায় শুক্রবার থেকে ৫০টাকা প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। বাজারে দেশি মুরগির ডিম নেই, অনেক ব্যবসায়ী ভোক্তাদের কাছে সোনালী মুরগির সাদা ডিম দেশি ডিম বলে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।
জেলা শহরের ফার্মের মোড় এলাকার জাহাঙ্গীর ডিমের আড়তের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা বেশি দামে ডিম কিনে আনি খামারিদের কাছ থেকে। যেখানে ডিম উৎপাদিত হয় সেখানে ডিমের দাম বেশি রাখলে আমরা পাইকারি ডিম ব্যবসায়ীরা কোথায় অভিযোগ করবো। আমরা বিভিন্ন খামারিদের কাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করে শহরের বিভিন্ন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। গত এক সপ্তাহ ডিমের দাম যেমন বেশি ছিল মানুষ ডিম কিনেছেও কম। আগের ডিম স্টকে রয়েছে দুই তিনদিন পর ডিম বিক্রি করতে হয়েছে।
জেলা শহরের কাঁচারি বাজারের খুচরা ডিম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিদিন সকালে ডিমের দাম ঢাকা থেকে নির্ধারণ করা হয়। জেলার বড় আড়তদারেরা ঢাকায় কথা বলে দাম নির্ধারণ করেন।
তিনমাস যাবৎ ডিম বিক্রি অর্ধেক কমে গেছে। আগে সারাদিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডিম আমি বিক্রি করতাম। এখন ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণে দিনে ৬০০-৭০০ ডিম বিক্রি হয়। আর আগের তুলনায় ডিম বিক্রিতে লাভ খুব কম। বাজারে কোয়েল পাখির ডিমের চাহিদা অনেক বেশি কিন্তু উৎপাদন কম। তাছাড়া গরম ছিল তাই হাঁসের ডিমেরও তেমন চাহিদা ছিল না। দেশি হাঁস-মুরগির ডিমের চাহিদা থাকলেও ডিম পাওয়া যায় না। হাঁসের ডিম সব হাঁসের হ্যাচারি মালিকেরা কিনে নেয় বাচ্চা উৎপাদনের জন্য।
১৫০ পিস ডিম ১৮৪৫ টাকায় কিনেছেন আখড়া বাজার পিটিআই গলির মুদি দোকান ব্যবসায়ী মো. জালাল উদ্দিন।তিনি খবরের কাগজকে বলেন,ডিমের দাম বেশি তাই দোকানের জন্য ১২ টাকা ৩০পয়সা করে ১৫০ পিস ডিম ১৮৪৫ টাকায় কিনেছি। তাহলে ৫০ টাকা দামে খুচরা বিক্রি করলে ৮০ পয়সা এক হালিতে লাভ থাকবে। ডিমের মূল্য খামারিরা না কমালে বাজারে অস্থিরতা থাকবেই।
ডিম সিন্ডিকেটের বিষয়ে বাজারে ডিম কিনতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, অনেক সময় খামারিদের জিম্মি করে ডিমের পাইকাররা ডিম মজুদ করে রাখেন। এছাড়াও মাঝেমধ্যেই ডিম মজুদ করে সংকট তৈরি করে পাইকাররা। আলুর হিমাগারে ডিম মজুদ রেখে ডিমের সংকট দেখিয়ে অনেক সময় সিন্ডিকেট ডিম ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা। এসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই ডিমের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
বাজারে ডিম কিনতে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল কুমার চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, দুই হালি ডিম বুধবারে কিনেছিলাম ১২০ টাকা দিয়ে আজকে কিনেছি ১০০ টাকা দিয়ে। ডিমের দাম অবশ্যই ক্রয় ক্ষমতার ভেতরে থাকা উচিৎ। কোন যুক্তিতে একটা ডিম আমাদের ১৫ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষদের প্রোটিনের উৎস ডিম,ডাল। এগুলো কিনতে গেলে যদি বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয় তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষ কি খাবে? বাজারে তো মাছ, মাংস, সবজি, তেলসহ প্রতিটি পণ্যের দাম বেশি। এগুলো সিন্ডিকেট আগেও ছিল এখনও আছে। এসব সিন্ডিকেট শুধুমাত্র প্রশাসনের নজরদারি বাড়ালেই ভাঙা সম্ভব।
এদিকে ডিমের বাজার নিয়ে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. হাসান সারওয়ার খবরের কাগজকে বলেন, ডিমের নির্ধারিত মূল্যের বাইরে ডিম কেউ বিক্রি করে থাকলে তা বেআইনি। বর্তমানে প্রতি পিস ডিমের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিপণন প্রতিদিন পণ্যের মূল্য ও বাজারদর সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে রাখছে। কিশোরগঞ্জের ডিমের দাম খুব শীঘ্রই কমবে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
ডিমের দাম নিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সিয়াম আহম্মেদ বলেন, ডিমের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ইতোমধ্যে জেলার টাস্কফোর্স কমিটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।
তাসলিমা আক্তার মিতু/এমএ/