বয়স হয়েছে ৬০। শ্রবণপ্রতিবন্ধী। বয়সের ভার এবং শারীরিক অসুস্থতা মতিলতা রানি মহন্তের জীবনকে করে তুলেছে কঠিন। এক সময়ের সুন্দর জীবন এখন কেবলই কষ্টের।
স্বামী মারা গেছেন আট বছর আগে। তাকে ছেড়ে চলে গেছে ছেলেমেয়েও। এখন ভিক্ষাবৃত্তিই নিঃসঙ্গ মতিলতা রানির একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন সকালে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। ছুটে চলেন এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লায়। নিজের বাড়িঘর না থাকায় অন্যের বাড়িতে ছোট্ট একটি ঘর বানিয়ে সেখানেই একাকী জীবনযাপন করছেন।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নের বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামে থাকেন মতিলতা রানি মহন্ত। প্রায় আট বছর আগে তার স্বামী হরেন্দ্রনাথ মহন্ত মারা গেছেন।
তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী বেঁচে থাকতেই দেনায় জর্জরিত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান ছেলে পাতারু মহন্ত। তারপর থেকে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। একমাত্র মেয়ে সুমিত্রা মহন্তের বিয়ে হয়েছে ৩ বছর আগে। বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের নিতাই নামের এক ব্যক্তি তার বাড়িতেই মতিলতাকে থাকার জায়গা দিয়েছেন।
মতিলতা রানি একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তবে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও কোনো ভাতা পান না তিনি। ভূমিহীন ও ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মতিলতাকে কোনো সরকারি সাহায্য বা সুবিধা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এমন একজন অসহায় মানুষ সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিলতা রানি বলেন, ‘স্বামী মরি যাওয়ার পর থাকি একাই থাকো (থাকি)। ছেলেমেয়েরাও খোঁজখবর নেয় না। ভিক্ষা করি যা পাই, তা দিয়া কোনো রকমে কষ্ট করি চলি। কোনো সময় ভিক্ষা করতে না পারলে গ্রামের মানুষ সাহায্য দেয়, তাতেই খাই। সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা পাও না (পাই না)। অনেকবার মেম্বার চেয়ারম্যানকে ভাতাকার্ডের জন্য কইছি। তারা কেউ কাথাই শোনে না। সরকার কত মানুষকে বাড়ি দিছে। মুই একটা বাড়ি পানু (পাইনি)। বুড়া বয়সে কী করা, কোথায় যাই? কেউ খোঁজও নেয় না মোর। যদি মোক একটা ভাতাকার্ড আর বাড়ি করি দিল হয়। তা হলে বাকি জীবনটা শান্তিতে থাকনু হয়।’
আলাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘মতিলতা রানি আমার প্রতিবেশী। তিনি একজন অসহায় মানুষ। তার কেউ নেই। তিনি অবশ্যই সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। চেয়ারম্যান নিজে পুরো ইউনিয়নে ৭০০ থেকে ৮০০ ভাতাকার্ড করে দিয়েছেন। আমি কার্ডের কোনো বরাদ্দ পাইনি। তাই তাকে কার্ড করে দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
আলাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুস সাকির বাবুল বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড এতগুলো এলাকার মানুষের খোঁজ রাখা সম্ভব না। তা ছাড়া নতুন করে ভাতাকার্ড করা সম্ভব না। পুরাতন কার্ডধারী কেউ মারা গেলে, সেই জায়গা খালি হলে তবেই নতুন কাউকে কার্ড দেওয়া সম্ভব। তারপরেও যদি অনলাইনে আবেদন করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে চেষ্টা করব।
বর্তমানে কোনো বাড়ি বরাদ্দ নেই। কয়েক দিন আগে শুধু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য কিছু বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছিলাম। সেগুলো দেওয়া হয়েছে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর মো. আল কামাহ্ তমাল বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’