ঠাকুরগাঁও জেলায় হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছি। স্থানীয় রুহিয়া আজাদ মেলার হাতিগুলো জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ সময় জোর করে টাকা আদায় করছে মাহুত। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাজারের দোকানে গিয়ে চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাতিগুলো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামিয়ে দেয়। এরপর মাহুতরা গাড়ির চালক বা যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা দাবি করেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে গাড়ি আটকে রাখা হয়।
ঠাকুরগাঁও থেকে মোটরসাইকেলে রুহিয়া যাচ্ছিলেন মাসুম বিল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমি মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে হাতি। মাহুত এসে ১০০ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে যেতে দেবে না বলে জানায়। ভয়ে টাকা দিয়ে চলে আসি।’
এদিকে বিভিন্ন বাজারে দোকানদারদের কাছ থেকেও এমন চাঁদা তোলার অভিযোগ উঠেছে। জেলার ঢোলার হাট বাজারের ব্যবসায়ী ইয়াসিন আলী বলেন, ‘বেশ কিছুদিন হলো রুহিয়া আজাদ মেলায় সার্কাসের দল এসেছে। সেই সার্কাসের হাতিগুলো দিনের বেলা এসে দোকানে দোকানে চাঁদা নিচ্ছে। মাহুত এসে দোকানের সামনে হাতি দাঁড় করিয়ে টাকা চায়। টাকা না দিলে হাতি দিয়ে দোকানের সামনে বাধা সৃষ্টি করে। আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দিই।’
রুহিয়া আজাদ মেলার লাকি সেভেন সার্কাসের একজন হাতির মাহুত মিজান বলেন, ‘আগে সার্কাসে অনেক দর্শক আসত। কিন্তু এখন আর আগের মতো লোক হয় না। হাতির খাবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা যেখানে সার্কাস দেখাতে যাই, সেখানে স্থানীয়দের কাছে টাকা তুলি।’
মাহুতরা আরও দাবি করেন, হাতিগুলোর দেখভাল ও খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। সার্কাসের আয় কমে যাওয়ায় এই চাঁদা তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের কার্যক্রম জনজীবনে ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। অনেকেই এই ঘটনাকে সরাসরি চাঁদাবাজি বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিসিক মোড়ের মুদি ব্যবসায়ী রফিক উদ্দিন বলেন, ‘হাতি নিয়ে এসে এভাবে টাকা তোলা অন্যায়। আমরা প্রশাসনের কাছে এর প্রতিকার চাই। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে রুহিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, ‘হাতি দিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সার্কাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব এবং তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেব। পাশাপাশি হাতি ব্যবহার করে রাস্তা বা বাজারে চাঁদা তোলার বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।’
শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, ‘হাতি দিয়ে টাকা তোলা মোটেও ঠিক নয়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হতে হবে। এটা এক ধরনের প্রতারণা ও দুর্নীতি।’ ঠাকুরগাঁও বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা তাদের মৌখিকভাবে নিষেধ করেছি। এককভাবে এটা আমরা বন্ধ করতে পারব না। প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে এটি বন্ধ করার চেষ্টা করব।’
দেশে হাতি ব্যবহারের ওপর বেশ কিছু আইন রয়েছে। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী, হাতি বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি প্রয়োজন। হাতি দিয়ে এভাবে চাঁদাবাজি করা আইনত অপরাধ।