গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে তিনটি ব্রিজ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা পরিষদের অর্থায়নে করা কাজটি শেষ না করেই আওয়ামী লীগের এক নেতা পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ঘটনার তদন্তে বুধবার (১ জানুয়ারি) জেলা পরিষদে অভিযান চালায় দুদক।
তাদের তদন্তে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ আছে, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম কাজ শেষ না করেই কর্মকর্তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পুরো টাকা দিতে বাধ্য করেন। এসব ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, কাশিয়ানী উপজেলার মাঝকান্দি-খাগড়াবাড়িয়া সড়কে ২০১৫ সালের শুরুতে তিনটি ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরই টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পায় উপজেলার মেসার্স হাবীব অ্যান্ড কোং নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই কাজে প্রথম বিল পরিশোধ করা হয় ৫৪ লাখ ৭ হাজার ২১৭ টাকা। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিল পরিশোধ করা হয় ২৬ লাখ ১২ হাজার টাকা। আর ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারের রক্ষিত জামানত চার লাখ ৪৮ হাজার ৭২১ টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কাজের মূল্য নির্ধারণ ছিল ৯০ লাখ টাকা। হাবীব অ্যান্ড কোং কাজটি পেলেও আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে কাজটি করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন কিলোমিটারের একটি এইচবিবি (ইট বিছানো) সড়ক ও তিনটি ব্রিজ নির্মাণে ২০১৬ সালের পর কাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালে রাস্তার কাজ হয়ে গেলেও ঠিকাদার ব্রিজের কাজ শেষ করেননি। তিনটি ব্রিজ নির্মাণ শেষে অ্যাপ্রোচ সড়ক না বানিয়ে ঠিকাদার পুরো টাকা তুলে নেন। এতে স্থানীয়দের ওই ব্রিজগুলো কোনো কাজেই লাগছিল না। পরে ওড়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ৪০ দিনের সৃজনশীল কর্মসূচির শ্রমিকের মাধ্যমে মাটি দিয়ে দুটি ব্রিজে ওঠানামার ব্যবস্থা করে দেন। আর একটি ব্রিজে স্থানীয়রা মই দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন।
মাইজকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘কাজের মান একেবারেই ভালো ছিল না। আমরা অনেকবার প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন ও সহকারী প্রকৌশলী আনিচুর রহমান কাজ বুঝে নিয়েছিলেন। সে সময়ে তারা বলেছিলেন, ব্রিজে ওঠার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। ঠিকাদার গোপালগঞ্জ শহরের প্রভাবশালী লোক হওয়ায় আমরা ভয়ে কিছু বলতেও পারিনি।’
ওড়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান বদরুল আলম বিটুল বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের আড়কান্দি খালের ওপর ২০১৭ সালে জেলা পরিষদ তিনটি ব্রিজ নির্মাণ করে। কিন্তু অ্যাপ্রোচ সড়ক না করেই অফিস কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল দিয়ে দেয়। ওই এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজগুলো ব্যবহার করতে পারছিলেন না। আমি আমার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৪০ দিনের সৃজনশীল কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে দুটি ব্রিজের অ্যাপ্রোচে মাটি দিয়ে জনগণের হাটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। অন্যটিতে গ্রামবাসী বাঁশের মই লাগিয়ে ওঠানামা করেন।’
জেলা পরিষদের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, ‘যখন ব্রিজের কাজ হয় তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। ব্রিজের কাজ করেছে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। তিনি কাজ শেষ না করে অস্ত্রের মুখে ফাইলে সই করিয়ে অর্থ তুলে নেন।’ তবে ৫ আগস্টের পর লাপাত্তা থাকায় সাইফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় জেলা পরিষদের অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। গতকাল বুধবার সকালে দুর্নীতি দমন কমিশন গোপালগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-পরিচলক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল এ অভিযান চালায়। সংস্থাটির উপ-পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ‘ব্রিজের কাজ শেষ না করেই জেলা পরিষদের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার মিলে অর্থ তুলে নেন। অভিযানে এর সত্যতা মিলেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেছেন, ‘সরজমিনে পরিদর্শন করে জনগণের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।