সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ বিষয়ে টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার লোকজন।
শহরের শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে হাওরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে সনাক এই সভার আয়োজন করে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও হাওরে বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। সভায় সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জ সনাকের সভাপতি নাজনীন বেগম।
নাজনীন বেগম জানান, সনাকের পক্ষ থেকে জেলার আটটি উপজেলায় ১৪ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ৪৬টি বাঁধের কাজের প্রকল্প পরির্দশন করা হয়েছে।
এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পের কাজ যাদের নামে তারা না করে অনেক প্রকল্প অন্য লোকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। একই পরিবারের সদস্যরা একাধিক প্রকল্পের কাজে যুক্ত রয়েছেন। যেটি নীতিমালা পরিপন্থী। ২১টি প্রকল্পে মাটির পরিবর্তে বালুর পরিমাণ বেশি দেখা গেছে। বেশির ভাগ বাঁধেই নীতিমালা অনুযায়ী মাটি শক্তকরণ, ঘাস লাগানো হয়নি। পরির্দশন বই নেই। বেশির ভাগ প্রকল্প গণশুনানি করে নেওয়া হয়নি।
পরির্দশনকালে এসব প্রকল্পের ৩৩টিতে প্রকল্পের সব তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড পেয়েছেন তারা। কোথাও বাঁধের প্রস্থ, উচ্চতার উল্লেখ নেই। এসব দুর্বলতা কাটাতে সনাকের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু এবং শেষ করার বিষটিতে জোর দেওয়া। প্রকল্প নির্ধারণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে গণশুনানি নিশ্চিত করা। পিআইসি রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো বিবেচনায় গঠন না করা।
কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী পিআইসিকে সময়মতো প্রতিটি কিস্তির বিল পরিশোধ করা। কাজের সময়কালে প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি না করা। একই সঙ্গে পাউবো শাখা কর্মকর্তাকে একই উপজেলা দুই বছরের বেশি সময় না রাখা। কাজে প্রশাসন ও পাউবোর তদারকি জোরদার করা।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, হাওরে বাঁধ নির্মাণ একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই কাজ সবাইকে মিলেই করতে হবে, এখানে সবার সহযোগিতা দরকার। হাওরে সময় ধরে সব কাজ করা যায় না। এবারও অনেক হাওর থেকে পানি ধীরে নেমেছে। আবার কোথাও কোথাও মাটির সংকট আছে। নানা কারণেই কাজে কোথাও কোথাও কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে কাজের অগ্রগতি ভালো। আমরা সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সব কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছি।
সুনামগঞ্জ সনাকের সহসভাপতি খলিল রহমানের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সনাক সদস্য কানিজ সুলতানা। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন, সামাজিক সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক রমেন্দ্র কুমার দে, সনাক সদস্য ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে, সনাক সদস্য আইনুল ইসলাম বাবলু, হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়, সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক প্রমূখ।
তারা হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানান। একই সঙ্গে, হাওরের ফসল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরগুলো খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, বাঁধের কাজে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন, প্রকল্প নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে অনিয়মের কারণেই কাজে বিলম্ব ও গাফিলতি হয়।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়সীমা ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি। সুনামগঞ্জে এবার ১২টি উপজেলার ৫৩টি হাওরে ৬৮৬ প্রকল্পে বাঁধের কাজ হচ্ছে। এ জন্য প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৭ কোটি টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেছেন, এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৯০ভাগ। আমরা আরও সাতদিন সময় বাড়ানোর আবেদন করেছি। এই সময়ের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করা হবে।
দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী/মাহফুজ