৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি ঘটছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল থাকলেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে গত চার মাসে এক ডজনের বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
৫ আগস্টের পর কারাবন্দি অনেক সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়ে অপতৎপরতা শুরু করেছেন। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, পেশি শক্তির প্রদর্শন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে এসব কাজে জড়িত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও অপরাধ প্রবণতা কমছে না।
এদিকে পরপর কয়েকটি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অবৈধ অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ফুলতলা উপজেলায় দুর্বৃত্তের গুলিতে জুয়েল মোল্লা ওরফে সোলায়মান নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন। স্থানীয় জামিরা বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকে ওতপেতে থাকা সন্ত্রাসীরা তাকে শটগান দিয়ে গুলি করে। এর মধ্যে একটি গুলি তার কোমরে বিদ্ধ হয়।
একই দিন খানজাহান আলী থানার গফ্ফার ফুড বালির ঘাট থেকে তাজকীর আহমেদ নামে এক ব্যক্তির বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার জেরে ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাকে ডেকে এনে খুন করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ২ মার্চ খুলনার রূপসা নদীর চরে মাংস ব্যবসায়ী আরিফ হত্যা মামলার আসামি জুয়েল শেখের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সেনের বাজার এলাকার মাংস বিক্রির টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি তিন কসাইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে জুয়েল শেখ ও রুবেল শেখ মাংস ব্যবসায়ী আরিফকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে স্থানীয়রা জুয়েল শেখকে ধাওয়া দিলে তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন। দুই দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়।’
২৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুন হন একটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির সেলসম্যান আল আমিন। হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে তার স্ত্রীর পরকীয়ার সম্পর্ককে তুলে আনে পুলিশ। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি খুলনায় মোবাইল ফোনে গেম খেলার কথা বলে ১০ বছরের শিশুকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ পাঁচ অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির কারণে ‘নাগরিক আন্দোলন’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতির উন্নতিতে তারা রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ও পুলিশকে সক্রিয় এবং বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নেতারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য মাদক কারবার, এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ, মহল্লার আধিপত্য ও নেতৃত্বের কোন্দলই দায়ী। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তরুণ বয়সীরা অপরাধ জগতে জড়িয়ে যাচ্ছেন। মহানগরীর পাড়ায় পাড়ায় মাদক কারবারের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে সমাজসেবীদের সঙ্গে নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।
জানা গেছে, খুলনা জেলায় গত জানুয়ারি মাসে ডাকাতির ঘটনায় একটি, চুরি ঘটনায় ছয়, খুনের ঘটনায় তিন, ধর্ষণের চার, নারী ও শিশু নির্যাতনের দুই, মাদকদ্রব্যবিষয়ক ৪১টিসহ মোট ১০৩টি মামলা হয়। এর আগে ডিসেম্বরে মামলা হয় ৯৫টি। এ ছাড়া মহানগরে জানুয়ারি মাসে ডাকাতির দুইটি, চুরির ১৪, খুনের দুই, অস্ত্র আইনে চার, দ্রুত বিচারের তিন, ধর্ষণের পাঁচ, অপহরণের দুই এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১৪টিসহ মোট ১৭৮টি মামলা হয়, যা ডিসেম্বরে ছিল ১৪৭টি।
নাগরিক সংগঠন ‘খুলনা নাগরিক সমাজ’র সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘খুলনায় জামিনে মুক্তি পেয়ে সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। ক্রমেই বাড়ছে খুনের ঘটনা। চলছে চাঁদাবাজিসহ অবৈধ দখলযজ্ঞ।’
তবে পুলিশ সুপার টি এম মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাই এখন পুলিশের জন্য প্রথম অগ্রাধিকার। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’ মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহা. আহসান হাবীব জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মেট্রোপলিটন পুলিশের তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। অপরাধ দমনে নিয়মিত প্যাট্রলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।