খুলনা নগরের সড়ক ও ড্রেনে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীন দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়িতে নাগরিক দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এর মধ্যে খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে সড়কে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ ব্যাহত হয়েছে। ফলে সময়মতো কাজ শেষ করা যায়নি।
একইভাবে খুলনায় সিটি করপোরেশনের ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের মেয়াদও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। নদীসংযুক্ত পাম্প স্টেশন নির্মাণকাজে বিলম্ব হওয়ায় গত ১৩ মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কেসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, রূপসা ঘাট-সংলগ্ন স্থানে পাম্প নির্মাণের জন্য দুটি শুষ্ক মৌসুম লাগবে। আরও কিছু ছোটখাটো কাজ রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে নাগরিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়িতে একদিকে যেমন প্রকল্পের অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে ধীরগতির কাজে ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে প্রায় ৩০ হাজার বাড়ি থেকে পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য পাইপ লাইনে অপসারণের পরিকল্পনা নেয় খুলনা ওয়াসা। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই খুলনা ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।
সড়কের প্রশস্ততা অনুযায়ী কোথাও সড়ক খুঁড়ে, আবার কোথাও মেশিনের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হবে। ওই পাইপের মধ্য দিয়ে পানি ও সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য নগরীর ভেতরের আটটি পাম্প স্টেশনে যাবে। সেখান থেকে পাম্প করে বর্জ্যগুলো নগরীর বাইরের মাথাভাঙ্গা ও ঠিকারাবাঁধ পরিশোধনকেন্দ্র দুটিতে পাঠানো হবে। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করে ম্যানহোল তৈরিতে ওয়াসার দীর্ঘ সময় লাগছে। এ ছাড়া অনেক স্থানে নতুন তৈরি করা ফুটপাত ও ড্রেন নষ্ট হচ্ছে।
প্রকল্প কর্মকর্তা ও ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহম্মদ জানান, সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময় প্রায় সাত মাস কাজ বন্ধ ছিল। সিটি করপোরেশন ওই সময় কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়। পরে মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় আবার কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মূল সড়ক বাদে অলিগলি ও ছোট সড়কে পাইপলাইন বসানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরপর মূল সড়কগুলোতে পাইপলাইন বসানোর কাজ শুরু হবে। তবে মূল সড়কে ব্যস্ততার কথা বিবেচনায় প্রকল্পের শেষ দিকে সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি করা হবে।
অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়িতে ভোগান্তিতে রয়েছেন নগরবাসী। প্রায় দুই মাস ধরে সোনাডাঙ্গা মজিদ সরণিতে ড্রেন খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। সড়কের ওপর ফেলে রাখা পেড়িমাটির স্তূপ, ভারী মেশিন, ঢালাই কাজে যানচলাচলে প্রতিবন্ধকতায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকার ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ শুরু হয়। প্রথম দফায় ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত ৮৮ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রূপসা ঘাট-সংলগ্ন পাম্প স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পাম্প স্টেশন নির্মাণের জন্য দুটি শুষ্ক মৌসুম লাগবে। ফলে কাজের মেয়াদ আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে।
নাগরিক সংগঠন বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামান বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় কোনো প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। এতে প্রকল্পে অর্থব্যয় বৃদ্ধিসহ সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।’ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ‘কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। প্রথম দফায় পাম্প নির্মাণকাজে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তেমন কেউ অংশ নেয়নি। ফলে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র দেওয়া হবে।’