বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) দিনাজপুরের নশিপুর ভিত্তি পাটবীজ খামার লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। যুগ্ম পরিচালক কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তা মিলেমিশে এই লুটপাট চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখানকার মানুষের বক্তব্য ‘ভিত্তি পাটবীজ খামারে একবার কেউ বদলি হয়ে এলেই খুলে যায় ভাগ্যের চাকা। তাদের (কর্মকর্তা-কর্মচারীদের) স্ত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় লাখ লাখ টাকা।’
৫০০ একর আবাদি জমি নিয়ে দিনাজপুরে বিএডিসির এই খামার। এই খামার থেকে প্রধানত ধান, আলু, পাটসহ আরও কিছু ফসলের বীজ উৎপাদন করা হয়। এখান থেকেই ধানের বীজ বিএডিসি বীজ প্রসেসিং প্রক্রিয়াজাতকরণ (প্রসেসিং) সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বের হওয়া নন-সিড (অবীজ) পছন্দের নির্ধারিত ব্যক্তির মাধ্যমে বিক্রি করেন অসাধু কর্মকর্তারা। ফসলের বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পাঠানোর পর যেসব অবীজ থাকে তা গোপনে ট্রাকে করে অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে টেন্ডার প্রক্রিয়ার বাইরেও হাজার হাজার বস্তা নন-সিড (অবীজ) বিক্রির টাকা নিজের পকেটে পোরেন যুগ্ম পরিচালক সুলতানুল আলম। এই অনিয়মের সঙ্গে আরও যুক্ত রয়েছেন তার আস্থাভাজন দুই সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফ ও শেখর কুমার সাহা।
সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফ ও শেখর কুমার সাহা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৭ সালে বদলি হয়ে নশিপুর ভিত্তি পাটবীজ খামারে আসেন। এরপর থেকে তারা যুগ্ম পরিচালকের এই (পাটবীজ) কার্যালয়ে রয়েছেন ৯ বছর। এই দুই সহকারী পরিচালক এখানে আসার পর তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা অফিসের সব দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। তাদের বাইরে যুগ্ম পরিচালকের সঙ্গে কথা বলারও কোনো সুযোগ নেই বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, যুগ্ম পরিচালক সুলতানুল আলম ২০২১ সালে নশিপুর ভিত্তি পাটবীজ খামারে বদলি হয়ে আসেন। প্রথমদিকে তিনি নিজের মতো করে খামার পরিচালনার চেষ্টা করেন। কিন্তু সহকারী পরিচালকদের রাজনৈতিক দাপট এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের অসহযোগিতায় হার মানেন যুগ্ম পরিচালক। এরপর থেকে তিন কর্মকর্তা মিলেমিশে লুটেপুটে খাচ্ছেন এই খামার।
অভিযোগ রয়েছে, নশিপুর ভিত্তি পাটবীজ (যুগ্ম পরিচালক) খামার থেকে অবসর নেওয়া হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ নূরনবীকে সিরাজগঞ্জ থেকে এনে অবৈধ কাগজপত্র ঠিক করার দায়িত্ব তুলে দেন যুগ্ম পরিচালক সুলতানুল আলম। কাগজপত্র ঠিক রেখে লাখ লাখ টাকা তিন কর্মকর্তাকে পাইয়ে দেওয়াই তার কাজ। বিনিময়ে নূরনবীও ভাগ পাচ্ছেন। তাই নূরনবী দাপটের সঙ্গে হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিকবার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে লাভ হয়নি। কারণ এই অফিসের তিন কর্মকর্তাই তার জিম্মাদার।
জানা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকারী নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কোনো ধরনের প্রচার না করেই বিভিন্ন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব দরপত্রের মাধ্যমে গাড়ি/ট্রাক্টর, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, বালাইনাশক, বীজ, অবীজ, ব্লিচিং পাউডার কেনা এবং বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ করা হয়েছে। অনেক সময় নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে কাজ ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফ টেন্ডার কমিটির সদস্যসচিব, তিনি এই অনিয়মের মূল হোতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রাক্টর, হারভেস্টারসহ খামারের গাড়ি মেরামত না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে দিনাজপুর টার্মিনালের জামাইবাবু গ্যারেজ মালিকের স্বাক্ষর এবং জাল কাগজপত্র। এ ছাড়া এই খামারে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিকদের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্নীতি হয়ে আসছে। এখানে অতিরিক্ত শ্রমিক দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া নিয়মিত বিষয়। এই দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত সহকারী পরিচালক আলী রেজা। সে জন্য তিনি অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেন।
সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফ ও তার স্ত্রী শাহিদা বেগমের প্রায় ডজনখানেক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে এবং এসব অ্যাকাউন্টে নূরনবীর টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম আর অ্যাগ্রো মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে আট লাখ টাকা শ্রমিক ইলিয়াস আলীর নামে ইস্যু করে। এই আট লাখ টাকা পুনরায় সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফের অ্যাকাউন্টে জমার তথ্য পাওয়া গেছে।
আলী রেজার অনুগত কর্মচারী নূরনবী বিভিন্ন ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করেন। এরপর সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সেই টাকা জমা দেন- এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সম্পর্কে সহকারী পরিচালক আলী রেজা মোহাম্মদ শরীফ বলেন, এই খামারে ২৮ পদের বিপরীতে ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাই আমাদের অনেক কাজ করতে হয়। কেন একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা চাইলে নূরনবীকে এই খামারের হিসাব শাখার দায়িত্ব থেকে বের করে দেওয়া যাবে। তবে আমার স্ত্রী কোনো চাকরি করেন না। তিনি একজন গৃহিণী। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লক্ষাধিক টাকা থাকতেই পারে।