ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ি বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকা এই বাজারের এক কোণে ফুটপাতে বসে ছোট একটি খাবারের হোটেল। এখানে নেই ঝাঁ-চকচকে চেয়ার-টেবিল, নেই বিলাসবহুল পরিবেশ। আছে শুধু এক নারীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উদাহরণ। তার নাম ফিরোজা বেগম, সবাই যাকে পরম মমতায় ‘খালা’ বলে ডাকে। স্থানীয় অনেকেই হোটেলটিকে মানবিকতার প্রাঙ্গণ হিসেবে চেনেন।
বছর আগের কথা। জীবনের তাগিদে রান্না করে খাওয়ানোর কাজ শুরু করেন ফিরোজা বেগম। অভাব ছিল, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার লড়াইও ছিল। পাশে ছিলেন স্বামী মোফাজ্জল হোসেন। সে সময় ছিন্নমূল মানুষের কষ্ট কাছ থেকে দেখে অনুভব করেন- খালি পেটে থাকা কতটা যন্ত্রণার। সেই অনুভবই আজ তাকে ঠাকুরগাঁওয়ের মানবতার প্রতীক করে তুলেছে।
দোকানটিতে মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকায় ভাত, ডাল, ভাজি, সবজি, মাছ বা মাংস পাওয়া যায়। গ্রাহকদের বেশির ভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক, ভিক্ষুক কিংবা পথের মানুষ। আর তাদের মুখে খাবারের তৃপ্তি দেখেই যেন খুশি হন ফিরোজা বেগম।
জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে মানবিক করে তুলেছে জানিয়ে ফিরোজা বেগম বলেন, ‘এক সময় আমি সাত দিন না খেয়ে থেকেছি। তাই জানি, ক্ষুধা কতটা কষ্টের। যার যতটুকু সামর্থ্য, তাই দিয়ে খায়। কেউ কিছু না দিতে পারলেও, খালি হাতে ফিরিয়ে দিই না।’
তার এই উদ্যোগে পাশে আছেন ছেলে মাহমুদ হাসান। তিনিও মায়ের এই উদ্যোগে গর্বিত। বলেন, ‘মা আমাকে শিখিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় কাজ।’
এই দোকানের এক ব্যতিক্রমী রীতি হলো, প্রতি বৃহস্পতিবার এখান থেকে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হয়। সমাজের অবহেলিত মানুষ, যারা একবেলা খাবারের জন্য রাস্তায় বসে থাকে, তাদের জন্য এদিন ফিরোজা বেগম নিজ হাতে রান্না করেন। ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ এ খাবার পান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দিনমজুর বলেন, ‘খালার (ফিরোজা বেগম) মতো মানুষ আর কজন আছে? সপ্তাহে এক দিন হলেও পেট ভরে খেতে পারি।’ এক ভিক্ষুকের কণ্ঠেও ফুটে ওঠে এমন অনুভূতি। তিনি বলেন, ‘এই বাজারে অনেক দোকান আছে, কিন্তু খালার দোকানের মতো মমতা কোথাও পাইনি।’
ফিরোজা বেগমের খাবারের স্বাদ আর আন্তরিকতা শুধু দরিদ্রদের নয়, আকৃষ্ট করে মধ্যবিত্তসহ সামর্থ্যবানদেরও। ব্যবসায়ী, শিক্ষক কিংবা দোকানদাররাও মাঝে মধ্যে তার দোকানে খেতে আসেন। অনেকেই বলেন, এ খাবারের স্বাদ শুধু উপকরণে নয়, স্পর্শ করে হৃদয়কেও।
এদিকে ফিরোজা বেগমের মানবতা শুধু খাবার পরিবেশনেই থেমে নেই। কেউ অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজনে ওষুধ কিনে দেন। ফিরোজা বলেন, ‘আমি কোনো এনজিও না। কোনো সরকারি সাহায্যও পাই না। যা পাই, তা-ই ভাগ করে নিই। কারণ, আমি জানি কারো পাশে দাঁড়ানো কতটা জরুরি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের অনেকেই মনে করেন, ফিরোজা বেগম কেবল একজন দোকানি নন, তিনি মানবিকতারও প্রতীক। তার মতো মানুষ সমাজে বিরল। তার উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়ে অনেক স্থানীয় তরুণ-তরুণী এখন অসহায় মানুষের জন্য খাবার বিতরণের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। মানবতা, ভালোবাসা আর আত্মত্যাগ- এই তিনটি শব্দ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে ফিরোজা বেগমের গল্পে।
একটি ছোট দোকান, সীমিত সামর্থ্য, কিন্তু অসীম হৃদয়- এ নিয়েই ঠাকুরগাঁওয়ের ফুটপাতে গড়ে উঠেছে এক মানবিকতার গল্প। এই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ একজন মানুষকে কতটা মহান করে তুলতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সবার প্রিয় ফিরোজা খালা।