নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে ভোগ্যপণ্য লোড-আনলোডের কাজ (কুলি) করেন মিলন শরীফ। শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট এলাকায় গত ১৬ বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই মজুরি নিয়ে খেদ রয়েছে তার। রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করার অভিজ্ঞতা। নিজের অবস্থান তুলে ধরে মিলন শরীফ বলেন, ‘আমরা ২২ জন শ্রমিক একটি আটা-ময়দার মিলে পণ্য খালাসের কাজ করি। মজুরি পাই বস্তাপ্রতি ১০ টাকা। দিনে আমরা ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা আয় করতে পারি। এ টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।’
১৬ বছর আগে পটুয়াখালী থেকে যখন প্রথমবার নিতাইগঞ্জে কাজে আসেন তখন বস্তাপ্রতি তিন টাকা করে পেতেন জানিয়ে মিলন বলেন, ‘ওই সময়ই ভালো ছিলাম। এখন যে টাকা পাই, তা দিয়ে দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ ও ঘরভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। অন্য কাজও জানি না। তাই বাধ্য হয়ে এই কাজই করি।’
দেশের পাইকারি পণ্যের অন্যতম বৃহৎ বাজার নিতাইগঞ্জ। আটা, ময়দা, চিনিসহ দুই শতাধিক ভোগ্যপণ্যের মিল রয়েছে এখানে। এ ছাড়া দোকান-গদিঘর রয়েছে কয়েক হাজার। এসব মিলে মিলনের মতো অন্তত ৮ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ছয়টি নৌ-ঘাট দিয়ে পণ্য খালাসের পাশাপাশি প্রতিদিন শত শত ট্রাকে শ্রমিকরা পণ্য ওঠানামার (লোড-আনলোড) কাজ করে থাকেন।
নিতাইগঞ্জের অন্যতম ব্যস্ততম কেরোসিন ঘাটের শ্রমিক দেওয়ান হোসেন বললেন, ‘প্রথমে মিল থেকে পণ্য ঠেলায় তোলা হয়। তারপর ঘাটের সামনে গিয়ে আবারও মাথায় করে ৫০ থেকে ৮০ কেজি ওজনের বস্তা ট্রলারে তুলতে হয়। প্রতিটি মিলে ৫০ জনের বেশি শ্রমিক এ কাজ করেন। কাজটি খুবই পরিশ্রমের। দীর্ঘদিন ধরে মালিকদের কাছে আমরা মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু ব্যবসায় মন্দার কথা বলে তারা বারবার দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।’
নিতাইগঞ্জে কর্মরত শ্রমিকদের কোনো ধরনের কর্মনিরাপত্তা নেই জানিয়ে ডালপট্টির লোড-আনলোড শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা কাজ করি পয়সা পাই। এর বাইরে কেউ আমাদের কথা চিন্তা করে না। একজন শ্রমিক অসুস্থ হলেও সংসার চালাতে তাকে কাজ করতেই হবে। বস্তা ওঠানামায় শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই তারা দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেন না। চিকিৎসার খরচ শ্রমিককেই বহন করতে হয়।’
মে দিবসে সারা দেশে শ্রমিকদের ছুটি থাকলেও নিতাইগঞ্জে পণ্য খালাস চলমান থাকে জানিয়ে রহমতুল্লাহ নামে এক শ্রমিক সরদার বলেন, ‘কোনো শ্রমিক কাজ না করলে মজুরি পায় না। মে দিবসেও কোনো বন্ধ নেই। আসলে মিল মালিক কিংবা দোকানিরা শ্রমিকদের কথা ভাবে না।’
শ্রমিকদের মজুরিসহ একাধিক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে নিতাইগঞ্জ লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক আবদুর রহমান বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোসহ তাদের কয়েকটি দাবি নিয়ে ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে কথা বলছি। কিন্তু তারা শুধু বারবার মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সব শেষ কমিটি ছিল আওয়ামী লীগের লোকজনের। তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে শ্রমিক স্বার্থের জন্য কাজ করেনি। ফলে শ্রমিকরা তাদের দাবি পূরণ করতে পারেনি।’
শ্রমিকদের দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সভা-সমাবেশ করে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিতাইগঞ্জের শ্রমিকরা অবহেলিত। অর্ধশত বছর ধরে তারা মজুরি বাড়ানোসহ একাধিক দাবি জানালেও ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা তা কখনোই মেনে নেয়নি। দু-একবার নামমাত্র মজুরি বেড়েছে। কিন্তু তা দিয়ে এ বাজারে সংসার চলে না। আমরা বারবার শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মজুরি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে আসছি। আমাদের ৯ দফা দাবির আন্দোলন এখনো চলমান আছে। দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে।’
নিতাইগঞ্জ আটা-ময়দা, চাল-ডাল মিল মালিক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দীন বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমে যোগাযোগ করে থাকেন। এখানে বছরভিত্তিক দর নির্ধারণ করা হয়। যেমন ১০ বছর আগে ছিল বস্তাপ্রতি তিন টাকা। এখন ৫ থেকে ১০ টাকার মধ্যে শ্রমিকরা কাজ করেন। এরই মধ্যে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।’
এবার মিল মালিকরা সভা করে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করবেন বলে জানান তিনি।