গ্রামটির নাম সুখের বাতি। দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস এই গ্রামে। সবাই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের নাম সুখের বাতি হলেও সুখ নেই এখানে। এখানকার মানুষের সুখ কেড়ে নিয়েছে নদীভাঙন।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের এই গ্রামটিতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। একের পর এক বসতভিটা, আবাদি জমি ও স্থাপনা বিলীন হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের পেটে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে গ্রামটি।
সুখের বাতি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মহিবর রহমান (৬০)। বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে এখন দিশেহারা। এক সপ্তাহ আগে তার দুই বিঘা আবাদি জমি বিলীন হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদে। আট শতাংশের বসতভিটাটি বিলীন হয়েছে গত সপ্তাহে। ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি রাস্তার ওপর। দুই বিঘা আবাদি জমি ও আট শতাংশের বসতভিটাই ছিল তার সম্বল।
মহিবর রহমানের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো বালুভর্তি জিও ব্যাগ না ফেলায় গ্রামবাসী এই তীব্র নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। শেষ সম্বল আবাদি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে তিনি এখন নিঃস্ব। জীবিকার পথ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তার পরিবারের সুখ কেড়ে নিয়েছে নদীভাঙন। অভাব, অনিশ্চয়তা আর ক্ষুধায় দিশেহারা পরিবারটি জানে না তাদের আগামী দিনগুলো কী করে কাটবে? ঝড়বৃষ্টিতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তারা।
নদীভাঙনকবলিত দিনমজুর মোখলেস মিয়া (৫৫) জানান, সুখের বাতি গ্রামে একসময় সত্যিই সুখ ছিল। তারা সুখে বসবাস করছিলেন। কিন্তু নদীভাঙন গ্রামের সুখ কেড়ে নিয়েছে। সুখের বাতি গ্রামে এখন আর সুখ নেই। শুধু রয়েছে কান্না আর দুঃখ। নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে। চার দিন ধরে এই গ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদের গর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও স্থাপনা।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান জানান, গত কয়েক দিনে এ গ্রামের ৪২টি বসতভিটা ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে। পুরো গ্রামটি নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। একসময় সুখে ভরপুর সুখের বাতি গ্রামে এখন আর সুখ নেই। এ ছাড়া তার ইউনিয়নে ঘুঘুমারী, সোনাপুর ও নামাজের চর এলাকায়ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত তিন সপ্তাহে চারটি গ্রামে ১৪০টি বসতভিটা ও প্রায় ২৫০ বিঘা আবাদি জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে কয়েক শ বসতভিটা, বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি ও স্থাপনা।
তিনি অভিযোগ করেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো পরিদর্শন করলেও ভাঙন ঠেকাতে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ৮ এপ্রিল ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ১৮ এপ্রিল ওই সব ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজাইন সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় ভাঙন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে দ্রুতই ভাঙন ঠেকানোর কাজ শুরু করা হবে। সূত্র: বাসস।