কৃষির পাশাপাশি শিল্পসমৃদ্ধ জেলা নীলফামারী। এ জেলায় একদিকে যেমন মাঠ ভরা ফসল থাকে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানাতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন হয়। শিল্পের পণ্য প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানো হয়। তবে সংকট থেকে যায় কৃষিপণ্য সরবরাহে। জেলার ধান, গম, ভুট্টা, সবজির পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করতে গিয়ে কৃষকরা পড়তেন বিপাকে। তাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয় সরকার। আন্তনগর ট্রেনের সঙ্গে লাগেজ ভ্যান যুক্ত করা হয়।
কিন্তু দুবছর পেড়িয়ে গেলেও ওই লাগেজ ভ্যান ব্যবহারে সংশ্লিষ্টরা খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এতে কয়েক কোটি টাকার বগিগুলো এখন খালি পড়ে থাকছে। ট্রেনের কিছু অসাধু রার্নিং স্টাফ ও রেলওয়ে পুলিশ এই বগিগুলোর মাধ্যমে যাত্রী টানছেন। এতে তারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী রুটের ছয়টি ট্রেনে এ সুবিধা যুক্ত করা হয়। সিদ্ধান্ত ছিল কম খরচে কৃষক তাদের পণ্য বিভিন্ন গন্তব্যে সরবরাহ করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করতে তাদের যে খরচ হয়, ট্রেনের মাধ্যমে পাঠাতে প্রায় একই খরচ হচ্ছে। কখনো খরচের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া লাগেজ ভ্যানের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করতে হলে প্রতিটি পণ্য একাধিকবার ওঠানামা করাতে হয়। এতে সবজিজাতীয় পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া মিলছে না। যদিও রেলওয়ের একাধিক বিভাগ সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, এমন চিত্র কেবল চিলাহাটির নয়, সারা দেশের কোথাও কৃষক-ব্যবসায়ীরা লাগেজ ভ্যান ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লাগেজ ভ্যান কিনতে বাংলাদেশ সরকারের ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়। সেখানে দুই ধরনের ভ্যান কেনার সিদ্ধান্ত হয়। ৮-৯ টন ধারণক্ষমতার ব্রডগেজ লাগেজ ভ্যানের দাম ধরা হয় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। আর মিটারগেজের ক্ষেত্রে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চীন থেকে ১২৫টি ভ্যান আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ৭৫টি মিটারগেজ এবং ৫০টি ব্রডগেজ। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বহরে সেগুলো যুক্ত করা হয়।
যদিও আগে থেকেই রেলওয়েতে ৫০টি পুরোনো লাগেজ ভ্যান ছিল। এর মধ্যে সচল ছিল মাত্র ১৮টি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন লাগেজ যুক্ত হওয়ার পর পার্সেল পরিবহনে রেলের মাসিক আয় দাঁড়ায় ৭৭ লাখ টাকা। যদিও পুরোনো লাগেজ দিয়ে রেল আগে প্রতি মাসে আয় করত ৭২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৩৫৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে রেলের আয় খুব বেশি বাড়েনি।
সম্প্রতি নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ট্রেনের লাগেজ ভ্যানে পণ্য নেই। মালামালের পরিবর্তে সেগুলো যাত্রীতে ঠাসা। কথা হয় স্টেশনের পরিবহন বিভাগের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) ও রেলের রার্নিং স্টাফরা লাগেজ ভ্যানগুলো খালি থাকার সুযোগ নেয়। তারা এগুলোতে যাত্রী টানেন। এতে রেলের লাভ না হলেও তাদের পকেট ভারী হয়।’
অবশ্য আগ্রহী না হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। সেগুলো ফুটে উঠে সৈয়দপুর পৌর পাইকারি কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সৈয়দপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েলফেয়ার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আজমের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘ট্রাকে করে সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় সবজি পাঠাতে প্রতি কেজিতে দুই থেকে আড়াই টাকা খরচ পড়ে। কিন্তু ট্রেনে করে পাঠাতে খরচ হয় সাড়ে ৫ টাকার মতো। এ ছাড়া ট্রেনে পরিবহন করলে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন হয়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাতে তিন-চারবার সবজি ওঠানামা করাতে হয়। এতে সবজি নষ্ট হয়। তাই আমরা ট্রাকেই পণ্য আনা-নেওয়া করি।’
রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা এ এম এম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘রেলের যে লাগেজ ভ্যান রয়েছে, তার মাত্র পাঁচ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব ভ্যানকে লাভজনক করতে পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দিতে চায় রেলওয়ে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় লাগেজ ভ্যান বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা বা ভাড়ায় দেওয়ার বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়।’
লাগেজ ভ্যান বেসরকারি খাতে দিলে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।