ঢাকার ধামরাইয়ে সোমভাগ ইউনিয়নের সোমভাগ ও ফুকুটিয়া এলাকায় বংশী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সময়সীমা প্রায় ৬ বছর পার হলেও এখনো পর্যন্ত সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। ফলে বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে নৌকা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। যদিও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নৌকা পারাপার করা খুবই ভয়ের কারণ।
অপরদিকে শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকোই দু’পাড়ের মানুষের পারাপারের একমাত্র ভরসা। প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের ওই একমাত্র স্বপ্ন কবে সেতুটি নির্মাণ কাজ শেষ হবে। আর কবেই বা তাদের দুঃখ ঘুচবে। তা কেউ বলতে পারে না। এমনকি উপজেলা প্রকৌশলী অফিসও বলতে পারেননি কবে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। ঠিকাদার কিংবা এলজিইডি অফিসের সাপ লুডু খেলা করতে করতেই ৬ বছর পার। ঠিকাদার আদৌ কাজটি শেষ করবে কি না বলা মুশকিল। আর কাজ শেষ না হওয়া মানে হাজারো মানুষের ভোগান্তিরও অবসান হবে না।
জানা গেছে, উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়নের সোমভাগ-ফুকুটিয়া বংশী নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজের সিডিউল অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সেতু নির্মাণকাজ শুরু করেন সুরমা অ্যান্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাসময়ে কাজ সমাপ্ত না করে দুই দফায় সেতুর দুইটি পিলার উঠিয়েই ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যায়। কয়েক বছর এভাবে কাজ পড়ে থাকায় অনেক রড, বাশের খুটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ছবি: খবরের কাগজ
এরমধ্যে কাজটি সমাপ্ত করার জন্য উপজেলা এলজিইডি অফিস থেকে তিন দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠিও দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালের শেষের দিকে আবার কাজ শুরু করেন ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরপর নদীর মাঝখানে আরও দুটি পিলার নির্মাণ শেষ করার পর তৃতীয় দফায় আবার কাজ বন্ধ করে চলে যান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ভোগান্তির আর শেষ হয় না।
বর্তমানে সেতুর মাঝখানের গার্ডার তৈরি পুরোপুরি শেষ না করেই কাজ বন্ধ করে রেখেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সেতু নির্মাণ। এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় যাতায়াত করা কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। একদিকে অফিসগামী লোকজনের ভিড় অপরদিকে স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীদের নদী পারাপার। বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক দৃশ্যে পরিনত হয়ে থাকে। অনেক অফিসগামী লোকজন কিংবা শিক্ষার্থীরা ঠিক সময়ে তাদের স্ব স্ব গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, হাজারো মানুষের কষ্ট লাগবের জন্য এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে জিডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় সোমভাগ-ফুকুটিয়া বংশী নদীর ওপর ৯৮ দশমিক ১০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মাণের টেন্ডার করা হয়ে থাকে। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৭০ লাখ ৬ হাজার ৭৭৪ টাকা। কাজটি পান মেসার্স সুরমা অ্যান্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ যা জেভি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকেন।
আশুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল হালিমসহ আমিরুদ্দিন, কালাম বলেন, সোমভাগ ইউনিয়নসহ আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতের পথ এই নদীর উপর দিয়ে। তাদেরকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শুধু কি তাই? পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য ঢাকার বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বেচাকেনা করতে পারছে না। যার ফলে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছে না। কোনো রিকশা, ভ্যান বা গাড়ি এখান দিয়ে যাতায়াত করা সম্ভব নয়।
স্কুল শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন যে অবস্থা সেতুর কাজ আদৌ হবে কি না বা মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারব কি না জানি। ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ করা সবই যেন শুভঙ্করের ফাঁকি। নৌকায় পারাপার করায় স্কুলে যেতে প্রায়ই দেরি হয়। তাছাড়া ১০-১৫ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে আসতে হবে। তাই ব্রিজটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সময়ে শেষ হলে কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষের কষ্ট লাগব হবে। গ্রামের মানুষ চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে বর্ষা মৌসুমে খেয়া নৌকায় আর শুকনা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে তার উপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। তা ছাড়া যাতায়াতের জন্য প্রায় ১০/১২ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে যেতে হয়। কোনো পণ্য আনা নেওয়া করা যায় না। এখনো আমাদের মনে হয় এনালগেই পরে আছি। দেশ এগিয়ে চললেও আমরা এগিয়ে নেই। শুধু মাত্র একটি সেতুই বাঁধা।
শিলা রানী সরকার বলেন, সকালে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। একদিকে অফিসের লোকজন অপরদিকে শিক্ষার্থীরা। আবার ছেলেকে একাও ছাড়তে পারি না। নদীতে পানি চলে আসছে। কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে!
বর্তমানে সেতু নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে, এ সম্পর্কে ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী মিনারুল ইসলাম বলেন, আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বার বার তাগিদ দিচ্ছি যেন অতি দ্রুত সেতুর কাজ শুরু করেন। কিন্তু এখনো কোনো কাজ হচ্ছে না। চেষ্টা করছি সেতু নির্মাণের কাজটি যেন দ্রুত শেষ করা যায়।
মো. রুহুল আমিন/মাহফুজ