বন বিভাগের ট্রান্সপোর্ট পারমিশন (টিপি) নিয়ে একটি চক্র বৈধ বাঁশের সঙ্গে সংরক্ষিত বনের বাঁশ মিশিয়ে তা পাচার করছে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কাজটি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা নিষিদ্ধ সময়ে (টিপি বন্ধ থাকা) বাঁশ কেনাবেচা করেন না। আর পুরো প্রক্রিয়া চলার সময় যারা চোখ বুঝে থাকেন, সেই বন কর্মকর্তারা নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। বলেছেন, অপরাধী ধরতে তারা সক্রিয় রয়েছেন। বাঁশ উদ্ধারের ঘটনায় বন আইনে একাধিক মামলাও করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বংশবিস্তারের জন্য জুন থেকে আগস্ট- এই তিন মাস বাঁশ কাটা নিষিদ্ধ। এ ছাড়া ধোপাছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বাঁশ কাটার অনুমতি নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব নির্দেশনা অমান্য করে ধোপাছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বাঁশ কেটে ধোপাছড়ি খাল ও সাঙ্গু নদী দিয়ে রাতের আঁধারে পাচার করছেন। নদীপথে বাঁশগুলো দোহাজারী নিয়ে সেখান থেকে ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ধোপাছড়ির বনাঞ্চল থেকে বাঁশ পাচারের কাজে একটি চক্র ও কিছু ব্যবসায়ী জড়িত। তারা কিছু বাঁশ টিপি নিয়ে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করেন। তবে বেশির ভাগই সংগ্রহ করেন ধোপাছড়ির মংলারছড়া, চাপাছড়ি, ত্রিপুরা পাড়া, লেবুছড়ি, মাইনীসহ একাধিক এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে। পরে সেগুলো ধোপাছড়ি খাল ও সাঙ্গু নদীর পাশে মজুত করেন। এর মধ্যে বাঁশের বড় একটি অংশ প্রতি সপ্তাহের শুক্র অথবা শনিবার নদীপথ ব্যবহার করে চলে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। দীর্ঘদিন ধরে তারা কখনো বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আবার কখনো তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাঁশ পাচার করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নদীতে বাঁশের চালা তৈরি হওয়ার পর ধোপাছড়ি বন বিটকে দিতে হয় ২ হাজার টাকা। এ ছাড়া সাঙ্গু বন বিট নেয় ১ হাজার ও ধোপাছড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে দিতে হয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এ ছাড়া ধোপাছড়ি বাজার থেকে সাঙ্গু নদী হয়ে বাঁশের চালা লালুটিয়া এলাকায় পৌঁছালে লালুটিয়া বন বিটে দিতে হয় দেড় হাজার টাকা।
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাম্পপাড়ার বাসিন্দা মিনহাজুল হক মিলন বলেন, ‘ধোপাছড়ি বাজার থেকে প্রতি শনিবার নদীপথে কমপক্ষে ২০ হাজার বাঁশ যায়। এগুলোর বেশির ভাগই ধোপাছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে নেওয়া। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে বন বিভাগের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়।’
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কিছু বাঁশ বৈধভাবে আসে, আবার কিছু বাঁশ সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে বৈধ বাঁশের সঙ্গে মেশানো হয়। কিন্তু বর্তমানে বৈধ কিংবা অবৈধ সব ধরনের বাঁশ আহরণ, কাটা ও বিপণন নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রাতের অন্ধকারে নদীপথে বাঁশ পাচার হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে ধোপাছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাঁশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
বাঁশ ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি টিপি বন্ধের সময় বাঁশের ব্যবসা করি না। যে বাঁশ মজুত আছে, তা টিপি বন্ধের আগের।’ নিষিদ্ধ সময়েও সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কীভাবে বাঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কলটি কেটে দেন।
মো. আমিন নামে আরেক বাঁশ ব্যবসায়ী নিষিদ্ধ সময়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বাঁশ কাটার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার কাছে ৫০ হাজার বাঁশের টিপি থাকলেও মজুত আছে ৭ থেকে ৮ হাজার। টিপি চালু না হওয়া পর্যন্ত আমি বাঁশ পরিবহন করব না।’
ধোপাছড়ি বন বিট ও সাঙ্গু বন বিটে দায়িত্বরত কর্মকর্তা সুদন্ত চাকমা বাঁশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘সাঙ্গু বন বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনো বাঁশ নেই। ধোপাছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কিছু বাঁশ রয়েছে। সেখান থেকে পাচারের সময় অনেকগুলো জব্দ করেছি। এসব ঘটনায় বন আইনে তিনটি মামলাও হয়েছে।’
ধোপাছড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক কাঞ্চন কুমার সিংহ টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘বাঁশ কিংবা গাছের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, ‘বিষয়টি আমি এই প্রথম আপনার কাছ থেকে শুনলাম। এ বিষয়ে তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’